বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

গল্পকার খোকন কোড়ায়ার সাক্ষাৎকার


গল্পকার খোকন কোড়ায়া আমাদের অনেক গল্প শোনান। তিনি আমাদের মুগ্ধ করেন তাঁর লেখনির যাদুতে। আমরা তাঁর লেখা পেয়ে সেটা পড়া শেষ না করা পর্যন্ত উঠি না। তার লেখায় উঠে আসে মধ্যবিত্ত মানুষের হাসি-কান্না, আনন্দ বেদনা। তিনি মন খুলে বলেছেন খ্রীষ্টান সাহিত্যিকদের অবস্থা করণীয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুন গল্পকার সুমন কোড়াইয়া

প্রশ্ন: আপনার শৈশবের কথা বলুন?
: আমার জন্ম ঢাকা জেলার পুরান তুইতাল নামের ছায়া সুনিবিড় একটি নিভৃত পল্লীতে। যাবৎ আমি যত গ্রাম দেখেছি আমার কাছে আমাদের গ্রামটিই সবচেয়ে সুন্দর। তখন আমাদের গ্রামটি ছিলো খাল বিল পরিবেষ্টিত সবুজময়।

আমার চারপাশের বিচিত্র গাছপালা, নানা জাতের ফুল, ফল, পাখী, মাছ, জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ আর গ্রামের সহজ সরল মানুষদের মধ্যেই আমি বেড়ে উঠেছি। ছেলেবেলায় কত রকম খেলা যে আমরা খেলেছি- মার্বেল, ডাংগুলি, দাঁড়িয়াবাঁধা, বাননরী-শুলনরী (গরু চড়ানোর লাঠি দিয়ে এক ধরণের খেলা), গাছমাছ, পলানতী আরও কত খেলা। ঘুড়ি ওড়ানো আর মাছ ধরা ছিলো আমার কাছে খুবই আনন্দের ব্যাপার। চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, গরু দৌঁড়ানী আর নৌকা বাইচে যে কি পরিমান মজা হত তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ছেলেবেলার বন্ধু মানে প্রাণের বন্ধু। এখনও মিস করি সেইসব বন্ধুুদের। আর মিস করি মায়ের আদর- মায়ের হাতের রান্নার অপূর্ব স্বাদ।
প্রশ্ন: আপনার বাবা-মার নাম কি? তাঁরা আপনার জীবনকে কিভাবে প্রভাবিত করেছেন?
: আমার বাবা-মা দুজনই প্রয়াত। বাবার নাম আন্তনী মন্তি কোড়ায়া। বাবার পেশা ছিলো ক্যাটারিং। জীবনের বেশীরভাগ সময়ই বাবা দিল্লীতে চাকুরী করেছেন। আমার বাবার মনটা ছিলো শিশুদের মত সরল। বাবার সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই বাবাকে ঠকিয়েছে, ডস দিয়েছে সেই সব গল্পও বাবা আমাদের খোলা মনে বলতেন। বাবা বান্দুরা হলিক্রস হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। সংক্ষিপ্ত শিক্ষাজীবনেও বাবা অনেক কিছু শিখেছেন বিদেশী ব্রাদারদের কাছ থেকে। পেশায় রন্ধনশিল্পী হলেও বই পড়ার দিকে ঝোক ছিলো বাবার। রিটায়ার্ড করার পরে বাড়ীতে বাবাকে প্রায়ই দেখতাম তার টিনের বাক্স থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের কপাল কু-লা, দেবী চৌধুরাণী জাতীয় ্্্বই বের করে পড়তে। আমার মা প্রয়াত খ্রীষ্টিনা কোড়ায়া ছিলেন অত্যন্ত বুিদ্ধমতী, অত্যন্ত ধার্মিক একজন মহিলা আমার বাবার  উপার্জনের সামান্য টাকা দিয়ে মা খুব সুন্দরভাবে সংসার চালাতেন, কখনো মাকে ্্ঋণ করতে দেখিনি। পঞ্চম শ্রেণী পাশ বিদ্যে নিয়ে আমার মা কিছুদিন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন।
Vincent Khokon Corraya, Noted Christian Writer
লেখায় ব্যস্ত খোকন কোড়ায়া
মা ছিলেন সেন্ট ভিনসেন্ট ডিপল সোসাইটির একজন সক্রিয় সদস্য। অসুস্থ হয়ে ঢাকায় চলে আসার আগ পর্যন্ত মা আমাদের ধর্মপল্লীর মারীয়ার সেনা সংঘের সেক্রেটারীর গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। মা ছিলেন ্একজন ভাল সংগঠক। গ্রামের মহিলাদের সংগঠিত করে তিনি সেলাই শেখার স্কুল করেছিলেন। মা ছিলেন একজন ভাল পড়য়া। গল্প, উপন্যাস, ধর্মীয় বই থেকে শুরু করে ছাপার অক্ষরে হাতের কাছে যা কিছু পেতেন সবই পড়তেন। শুধু নিজে পড়েই তিনি তৃপ্ত হতেন না। অন্যদেরও তিনি বই উপহার দিতেন, বিশেষভাবে ধর্মীয় বই। পড়ার অভ্যাসটা মার কাছ থেকেই আমি পেয়েছি।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম সাহিত্যের নাম কি?        
: আমার প্রথম লেখা ছিলো কবিতাব্যতিক্রম ওটা ১৯৭৫ সনের শেষের দিকে সাপ্তাহিক প্রতিবেশীতে ছাপা হয়েছিলো।
প্রশ্ন: আপনি কেন এবং কিভাবে লেখালেখি শুরু করেন?
: এস এস সি পাশ করার পর আমি ময়মনসিংহ শহরে আমার মেঝো দাদার কাছে চলে আসি তার পরিবারে থেকে কলেজে পড়ার জন্য। তখন আমি আমার গ্রাম, আমার মা আর গ্রামের বন্ধুদের খুব মিস করতে থাকি। আমি বরাবরই অর্ন্তমুখী স্বভাবের। আমার মনে হতে থাকে আমার ভেতরে কিছু কথা জমে আছে, কিছু ক্ষোভ জমে আছে, কিছু কষ্ট জমে আছে যা আমার প্রকাশ করা দরকার। তখন নীহাররঞ্জন, ফাল্গনী, নিমাই, শরৎচন্দ্র, শংকর, বিমল মিত্র এবং বঙ্কিমচন্দ্রের বেশ কিছু উপন্যাস পড়া হয়ে গিয়েছিলো আমার। রবি ঠাকুরের গল্পগুচ্ছের অনেক গল্প পড়ে ফেলেছিলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে দুদিনের জন্য বইটি ধার নিয়ে। ইত্তেফাকের সাহিত্যের পাতা পড়তাম নিয়মিত। খ্রীষ্টিয়ান লিটারেচার সেন্টারেরগস্পেল হল এন্ড রিডিং রুমনামে একটি পাঠাগার ছিলো ময়মনসিংহ শহরের স্টেশন রোডে। প্রতি সন্ধ্যেবেলা ওখানে গিয়ে বিভিন্ন সাময়ীকি বইসহ নিয়মিত পড়তাম ওদের মাসিক সাহিত্য পত্রিকানবযুগপ্রতিবেশীতেতখন লিখতেন নিধন ডিরোজারিও, যেরোম ডিকস্তা, মার্ক ডিকস্তা, হেবল ডিক্রুজ, ফ্রান্সিস গমেজ, হেলেন গমেজ, নীলু রুরাম, উইলিয়াম অতুল, সুবল এল রোজারিও, আলো ডিরোজারিও, জেন কুমকুম রোজারিও, অনিমা চাকলাদার অনি এবং আরো অনেকে যাদের নাম আমার এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। তো তাদের লেখা পড়তে পড়তে একসময় মনে হলো লিখলে কেমন হয়? পরক্ষণেই মনে হল্ োআমি কি পারবো উনাদের মত লিখতে! অনেক দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে অবশেষে শুরু করলাম কবিতা দিয়ে। কবিতাটি প্রতিবেশীতে পাঠিয়ে আমার এক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। এক মাস পরব্যতিক্রমনামের কবিতাটি যখন ছাপার অক্ষরে আমার নামসহ দেখলাম তখন যে আনন্দটা পেয়েছিলাম তা জীবনের আর কোন আনন্দের সঙ্গে মেলানো যায় না।
প্রশ্ন: লেখা-লেখির গুরুত্ব কি?
:    লেখালেখির গুরুত্ব অপরিসীম।  লেখালেখিটা পাঠকের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি যে লিখে তার জন্যও  গুরুত্বপূর্ণ। যে সমাজ সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যতটা সমৃদ্ধ সে সমাজ ততটা উন্নত। সাহিত্য পাঠকের মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। খুলে দেয় মনের জানালা। সেই জানালা দিয়ে তাকিয়ে পাঠক দেখতে পায় এক নতুন পৃথিবী, সুন্দর পৃথিবী। আর একজন লেখকের কাছে লেখালেখি হল তার সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, সুখ-আনন্দ, ক্ষোভ, ঘৃণা আর ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। লেখালেখিটা লেখকের কাছে এক ধরণের বিশ্রাম, আবার বিনোদনও বটে।
প্রশ্ন: এই মাধ্যম দিয়ে সমাজকে কি কোনভাবে পরিবর্তন করা যায়?
:           অবশ্যই করা যায়। তবে এই পরিবর্তনটা হয় খুব ধীরে ধীরে। কিন্তু আমাদের সমাজে এই পরিবর্তনটা খুব বেশী আশা করা যায় না কারণ এখানে পাঠকের সংখ্যা খুবই কম। রুগী যদি ওষুধই না খায় তবে অসুখ ভাল হবে কিভাবে। আমাদের সমাজে শতকরা দশ জন মানুষও সাহিত্য পড়ে কিনা সন্দেহ। আমরা আসলেসমবায় সমিতি মধ্যে আটকে গেছি। সমবায় সমিতিগুলিকে ঘিরেই আমাদের সমাজ আবর্তিত হচ্ছে। এর বাইরে আমরা আর কিছু ভাবতে পারছি না, করতে পারছি না। কো-অপারেটিভ আমাদের অর্থনীতিতে একটি বড় ভূমিকা রেখে যাচ্ছে এটা সত্যি কিন্তু সমবায়ই সব নয়। বাইবেলেই লিখা আছেকেবল রুটিতেই মানুষ বাঁচে না।‘ 
প্রশ্ন: আপনার প্রকাশিত বই এবং গল্প উপন্যাসের সংখ্যা কতগুলো?
আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুটি একটি মিনি কবিতার বইসেই তোমাকেপ্রকাশিত হয়েছিলো উনিশশনব্বই সনে এবং একটি ছোটগল্পের বইসেপ্রকাশিত হয়েছিলো উনিশশতিরানব্বই সনে। আমি এখনও কোন উপন্যাস লিখিনি। প্রকাশিত ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় একশ’ (যেগুলি দিয়ে অন্তত ৫টি বই বের করা যায়) বড় কবিতা বিশ/পঁচিশটি হবে তবে টুকরো কাব্যের সংখ্যা (চার/ছয় লাইনের কবিতা) য়ের কাছাকাছি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বত্রিশ বছর ধরে আমি এবং সাইদুজ্জামান রওশন(প্রথম আলো বন্ধুসভার পরিচালক) ‘আমলকিনামে একটি ছোট কবিতা পত্র বের করছি। আমাদের জানামতে আকৃতির দিক থেকে   ‘আমলকি পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম কবিতাপত্র। আমলকিতে প্রকাশিত চার/ছয় লাইনের কবিতা সুধীসমাজে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।                                                                                                                                                                                                                                                  
প্রশ্নলেখা-লেখির জন্য কি ধরনের প্রস্তুতি নেন?
:   লেখা- লেখির জন্য প্রধান প্রস্তুতি হল পড়া। লিখতে গেলে পড়তে হয়। তবে শুধু সাহিত্য নয়, লেখা- লেখির জন্য সাহিত্যের পাশাপাশি দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মগ্রন্থসহ সব ধরণের লেখাই পড়া প্রয়োজন। লেখা-লেখির জন্য আরো প্রয়োজন তীক্ষè অর্ন্তদৃষ্টি আর কল্পনাশক্তি। আর একটি বিষয় হল মানুষকে ভালবাসতে হবে। সব শ্রেণীর, ভাল-মন্দ সব মানুষের জন্য মমত্ববোধ থাকতে হবে। কোন লেখা বিশেষ করে গল্প লেখার আগে সেটাকে প্রথম মনের মধ্যে সাজাই, একটা প্লট তৈরী করি। সেই প্লটটা নাড়াচাড়া আর ভাংচুর করতে করতে যখন মনে হয় একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে তখন লিখতে বসি কলম অথবা ল্যাপটপ নিয়ে।
প্রশ্ন: সাহিত্য নিয়ে আপনার পাঠকদের কাছ থেকে আপনি কি ধরনের প্রতিক্রিয়া পান?
:   বেশীরভাগই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। আমার কিছু ভক্ত আছে। তারা আমার লেখার প্রশংসা করে, আমাকে প্রেরণা যোগায়, লেখার জন্য আমাকে তাগিদ দেয়। সবচেয়ে ভাল লাগে যাদের কাছ থেকে আমি কখনও আশা করিনা তারাও আমার লেখার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানায়। আশি-নব্বই দশকে আমি যখনপ্রতি্েশীতে নিয়মিত লিখতাম তখন একদিন গ্রামে গিয়ে বিকেলে হেটে যাচ্ছিলাম গীর্জার মাঠের দিকে। আমাদের বাড়ী থেকে কয়েকটি বাড়ী পরেই আমার এক দূর সম্পর্কের নানার বাড়ী। বাড়ীর উঠানেই নানার সঙ্গে দেখা। নানা রিটায়ার্ড, বৃদ্ধ, লেখাপড়ার দৌঁড় ফোর ফাইভের বেশী হবে না। নানাকে নমষ্কার দিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। নানা বললো- শুন শুন কথা আছে। তুই যে প্রতিবেশীতে সব কথা লেখস আমার কিন্তু খুব ভাল লাগে। এত কম লেখস ক্যান, সব রইববারে লেখতে পারস না। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। গ্রামের একজন অল্প শিক্ষিত বৃদ্ধ মানুষ, সারা জীবন বাবুর্চির ক্জা করেছে সে- যে আম্রা লেখার ভক্ত হতে পারে এটা আমার কল্পনায়ও ছিলো না। খুব ভাল লেগেছিলো আমার, মনে হয়েছিলো আমার লেখক জীবন স্বার্থক। তারপর এই কিছুদিন আগে প্রতিবেশীর বর্ষা সংখ্যায় আমারএই মেঘলা দিনে একলাগল্পটি ছাপা হওয়ার পর সাভারের একটি বৃদ্ধাশ্রম থেকে একজন বৃদ্ধা ফোন করে বললেন - খোকন তোমার গল্পটা খুব ভাল লেগেছে। লেখা বন্ধ কোরোনা, অন্তত আমাদের কথা ভেবেও চালিয়ে যাও। আরেকটি খুব মজার ঘটনা ঘটেছিলো গল্প লেখা নিয়ে। লেখালেখির শুরুর দিকে আমি একটি গল্প লিখেছিলাম ফুটবল খেলা নিয়ে। প্রেমের গল্প। আমাদের গ্রামের দুটি ছেলে তখন ভাল ফুটবল খেলতো। গল্পটা ছাপা হওয়ার পর দুজনই বলে বেড়াতে লাগলো যে গল্পটা তাকে নিয়েই লেখা হয়েছে।বলছে , যেহেতু ফুটবল খেলা ছাড়াও গল্পের নায়কের অন্যান্য বৈশিষ্ট আমার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে তাই খোকনদা গল্পটা আমাকে নিয়েই লিখেছে। আবারবলছে, বললেই হলো তোকে নিয়ে লিখেছে, গল্পের নায়কতো শ্যামলা আর লম্বা কিন্তু তুইতো ফর্সা আর খাটো। শেষে মীমাংসাটা আমাকেই করতে হয়েছিলো।ওদের দুজনক্ েডেকে বলেছিলাম, দেখ তোরা দুজনই ভালো খেলোয়াড়, তোদের দুজনের সম্পর্কেই আমি ভাল জানি এবং পছন্দ করি। গল্পটা যখন লিখি তখন তোরা দুজনই আমার মনের মধ্যে ছিলি। বিরুপ প্রতিক্রিয়া যে পাইনি তা নয়। আঁতে ঘা লাগার কারণে হাত কেটে ফেলা সহ বিভিন্ন রকম হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কারো কারো সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিও ঘটেছে। লেখালেখির শুরুর দিকে অনেকে এমন মন্তব্যও করেছে, ‘আরে খোকন কি আর ওসব লিখতে পারে, বই টই ঘেটে অন্যদের লেখা জোড়া তালি দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে।
প্রশ্ন: খ্রীষ্টান সমাজে সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব বোধ করেন কিনা?
:   নিঃসন্দেহে। সত্যিকার অর্থে আমাদের সমাজে লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা করার মত কোন প্রতিষ্ঠান নেই। আমাদের কোন সাহিত্য পত্রিকা নেই যেখানে লেখকরা মন খুলে লিখতে পারবে। কোন প্রকাশনা সংস্থা নেই যারা আমাদের লেখকদের বই প্রকাশ করবে এবং পরিবেশকের দায়িত্ব নেবে।
প্রশ্ন: প্রতি বড়দিন ইস্টারে অসংখ্যা ম্যাগাজিন বের হয়। প্রতিটি স্মরণীকা বা ম্যাগাজিনের বাজেট কমপক্ষে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সেই সব স্মরণীকার জন্য অনেক লেখা দিতে হয়। লেখকদের সম্মানি দেওয়া হয় না। এই বিষয়টা সম্পর্কে কি বলবেন?
: এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। এটা আমাদের দীনতারই পরিচয় দেয়। আসলে আমাদের সমাজে লেখকদের কোন মূল্য নেই, কোন সম্মান নেই। আমরা খেলোয়ারকে টাকা দেই, গায়ককে টাকা দেই, নৃত্যশিল্পীকে টাকা দ্ইে, এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যারা উপস্থাপনা করে তাদেরও টাকা দেই কিন্তু লেখকের সম্মানী দিতে গেলে আমাদের ফান্ড ফুরিয়ে যায়। শুধু বড়দিন ইষ্টারের ম্যাগাজিনওয়ালাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা আছে যারা এখনও লেখকদের সম্মানী দেয়ার কথা মাথায় আনছে না। আর বড়দিন ইস্টারে অসংখ্য ম্যাগাজিন বের করার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি সংগঠন থেকে বের না করে প্রতিটি ধর্মপল্লী থেকে মানসম্পন্ন একটি ম্যাগাজিন বের করলে ভাল হয়। আসলে অনেক সংগঠন ম্যাগাজিন বের করে শুধু ফান্ড সংগ্রহের জন্য। বিজ্ঞাপন সর্বস্ব সেইসব ম্যাগাজিনে বিভিন্ন লেখা ছাপা হয় শুধু পাতা ভরার জন্য, সাহিত্য এখানে মুখ্য বিষয় নয়। আর আমাদের দুএকটি প্রতিষ্ঠান সেইসব ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপনের নামে উদার হস্তে দান করে নিজেদের স্বার্থেই। লেখকদের সম্মানী দেয়ার ব্যাপারে আমাদের  বোধোদয় কবে হবে জানি না।
প্রশ্ন: লেখক হিসেবে আপনাকে কি ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হতে হয়?
লেখালেখি করাটাই একটা চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জটা শুরু হয় পরিবার থেকে। পরিবারের সাপোর্ট যদি না থাকে তবে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়াটা দুরুহ হয়ে দাঁড়ায়। একজন সত্যিকারের লেখকের মধ্যে থাকে কিছু আদর্শ, নৈতিকতা, সততা লেখক হয় প্রতিবাদী, অন্যায়ের কাছে সে মাথা নত করে না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এই সদগুণগুলিই লেখকের চলার পথে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন: খ্রীষ্টান লেখকদের দৈনদশা থেকে উত্তরণের সমাধান কিভাবে করা যায় বলে আপনি মনে  করেন?
:           প্রথমত লেখকদের একটি শক্তিশালী সংগঠন দরকার, সত্যিকারের লেখকরাই যেটা পরিচালনা করবে। এই সংগঠনের মাধ্যমে অনেক কিছুই করা সম্ভব। ছাড়া সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সমাজে বড় মাপের দুএকটি সমবায় সমিতি আছে তারা বিভিন্নভাবে অনেক টাকা পয়সা খরচ করে। তাদের পক্ষে কোন ব্যাপারই না বছরে মাত্র দেড়/দুই লক্ষ টাকা খরচ করে দুজন খ্রীষ্টান লেখকের বই প্রকাশ করা। আগেও বলেছি আমাদের একটি প্রকাশনা সংস্থার খুব প্রয়োজন। আরো প্রয়োজন একটি রুচিশীল সাহিত্য পত্রিকার, নিদেনপক্ষে একটি লিটল ম্যাগাজিনের, সংগঠনের মাধ্যমে লেখকরাই যেটা চালাতে পারে।
প্রশ্ন: সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
: আপনাকেও ধন্যবাদ। আরো ধন্যবাদ আমার লেখার পাঠক ভক্তদের।
প্রশ্ন: সাহিত্য রচনায় আপনি কি কি পুরস্কার পেয়েছেন?
উ: আমি প্রথম পুরষ্কার পাই প্রতিবেশী থেকেআর্চবিশপ গাঙ্গুলী সাহিত্যপুরষ্কার। এরপর জাতীয় চার্চ পরিষদ থেকেশ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকারহিসেবে পুরষ্কার পাই। রমনা প্রগতি সংঘ থেকেশ্রেষ্ঠ গল্পকারহিসাবে পরপর তিনবার এবং ত্রিবেণী ছাত্র কল্যাণ সংঘ থেকেওশ্রেষ্ঠ গল্পকারহিসাবে পরপর তিনবার পুরষ্কার পাই। তবে একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পুরষ্কার হল তার ভক্তদের ভালবাসা।
প্রশ্ন: কোন লেখকের বই পড়েন?
: অনেক লেখকের লেখাই পড়েছি এবং পড়ছি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে নীহাররঞ্জন, ফাল্গুনী, শরৎচন্দ্র, সুকান্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, নিমাই, শংকর, বিমল মিত্র, তারাশংকর, মানিক, বনফুল, বিভূতিভূষণ, বুদ্ধদেব বসু, বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল, শীর্ষেন্দু, শক্তি, হুমায়ুন আহমেদ, মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, মইনুল আহসান সাবের, সেলিনা হোসেন, নীর্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, নাসরীন জাহান এবং আরো অনেকের বই আমি পড়েছি বিশ্ব সাহিত্যের অনেক উপন্যাস, ছোটগল্পের অনুবাদও পড়েছি। তবে পড়তে বেশী ভাল লাগে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং কোলকাতার দুজন কম জনপ্রিয় লেখক মতি নন্দী এবং গ্ৗেরকিশোর ঘোষের বই।
প্রশ্ন: সাহিত্য রচনাকে কি পেশা হিসেবে নেওয়া যায়?
: নেয়াটা খুব কঠিন। আমাদের দেশে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন লেখক আছেন যারা সাহিত্য রচনাকে একমাত্র পেশা হিসেবে নিয়েছেন।           হুমায়ুন আহমেদ এখানে ব্যতিক্রম। কারণ দুই বাংলার মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি লেখালেখি করে প্রচুর উপার্জন করেছেন। অবশ্য লেখকের স্ত্রী / স্বামী কেউ উপার্জনশীল হলে সেই লেখক ঝুকিটা নিতে পারেন।
প্রশ্ন: খ্রীষ্টানদের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে লেখালেখির পরিমাণ কম কেন?
: একটা হতে পারে আমাদের হীনমন্যতা, আমরা গন্ডীর বাইরে যেতে ভয় পাই। আরেকটা হতে পারে আমাদের অযোগ্যতা, জাতীয় পর্যায়ে লেখালেখির জন্য আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারিনা। আর একটা হলো লেখালেখির ব্যাপারে আমাদের সিরিয়াসনেসের অভাব, আমরা নিবেদিতপ্রাণ হতে পারি না, আমরা লেগে থাকতে পারিনা। আর একটা হলো লেখালেখি করে যারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের অনেকের মধ্যেই একটা ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে ভাব আছে। অনেকেই তাদের সংসারের প্রতি, পরিবারের প্রতি পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেননি। সংসার ভেঙ্গে গেছে, স্ত্রী/স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, আবার নতুন সর্ম্পক গড়েছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তার স্ত্রীকে যথেষ্ট অবহেলা করেছেন। আমরা অনেকেই আমাদের মূল্যবোধের কারণেই এটা পারি না। পারিনা সংসারের প্রতি, পরিবারের প্রতি, স্ত্রী/স্বামীর প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করতে। পারিনা মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেড়াতে। আর একটা বিষয়ও মনে রাখা দরকার জাতীয় পর্যায়ে লেখালেখি করলেই যে বড় লেখক হয়ে যাবে আর জাতীয় পর্যায়ে লেখালেখি না করলে কিছুই নয় এটা ভাবাও ঠিক নয়। কি লিখা হচ্ছে, লেখার মান কেমন সেটাই বড় কথা তা সেটা যেখানেই প্রকাশিত হোকনা কেন। আরেকটা বিষয় বলা দরকার আজকাল দেখা যাচ্ছে লেখালেখি শুরু করতে না করতেই অনেকে হুটহাট করে বই বের করে ফেলেন। হয়তো তাদের ধারণা বই বের করলেই তারা বড় লেখক হয়ে গেলেন, লেখকদের তালিকায় তাদের নাম উঠে গেলো। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এতে লেখকের ক্ষতিই হয় বেশী। লেখালেখির শুরুর দিকে অনেক লেখাই দুর্বল হয় এবং দুর্বল লেখাগুলি বইয়ে গ্রন্থিত হয়ে  যায়, রেকর্ড হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে লেখক নিজেই নিজের লেখাগুলি দেখে লজ্জা পায় এবং আফসোস করে বলে- ইস কেন যে তখন তাড়াহুড়া করে বইটা বের করতে গিয়েছিলাম!
প্রশ্ন: নতুন লেখকদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
: লেখালেখির জন্য প্রচুর পড়াশুনা করতে হবে, সাহিত্যের সঙ্গে অন্য সব বিষয়ও পড়তে হবে। সাহিত্য নিয়ে আড্ডা দিতে হবে। মানুষকে ভালবাসতে হবে, দেশকে ভালবাসতে হবে। নিজেকে সৎ থাকতে হবে, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা চলবে না। সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। আর পাশাপাশি থাকতে হবে আমাদের খ্রীষ্টিয় মূল্যবোধ।
প্রশ্ন: আপনার লেখালেখি নিয়ে কি স্বপ্ন দেখেন?
: আমরণ লিখে যেতে চাই।
প্রশ্ন: সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
উ: আপনাকেও ধন্যবাদ


(সাক্ষাৎকারটি সাপ্তাহিক প্রতিবেশীতে পূর্ব প্রকাশিত)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন