বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মুক্তার। বিছানা ছেড়ে বারান্দায় যায় সে। সকালবেলার এ রকম বৃষ্টির সময় শুধু শুয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে। কিন্তু আকাশের বৃষ্টি দেখে তার মনটা অবসাদে ভরে গেল। সে ঘরে গিয়ে দীপকে জাগাল। বলল, ওঠ। সকাল হয়ে এসেছে। দীপ উঠল ঘুম থেকে। সে বলল, কী ব্যাপার সকাল সকাল মনটা ভার কেন?
কই না তো?
তোমার মুখ দেখেই সব বুঝতে পারি।
নাহ্ কিছু হয়নি।
সকালবেলা এত কথা না বাড়িয়ে দীপ ফ্রেশ হয়ে নিল। মুক্তা সকালের নাশতা তৈরি করে দীপকে খেতে দিল। দীপ অফিসে যাওয়ার আগে স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে বলল, 'কই বললে না তো তোমার মনটা খারাপ কেন?'
জান না আজ ১ আষাঢ়?
ও! দীপের মুখটা কালো হয়ে গেল। সে বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আমি আজ তাড়াতাড়ি ফিরব।
বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে গেল দীপ। সেদিকে তাকিয়ে রইল মুক্তা। তাকে এখন সারা দিন বাসায় একা থাকতে হবে। দুই বছর ধরে তাকে এভাবে একাই থাকতে হয়।
চার বছর আগের কথা। মুক্তা ১ আষাঢ় প্রতিবন্ধী এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। মেয়েটির পা থেকে কোমর পর্যন্ত অবশ। মাথা অস্বাভাবিক বড়। অনেক কষ্ট হয়েছিল ওকে জন্ম দিতে। ডাক্তার বলেছিলেন, মা বাঁচলে বাচ্চা বাঁচবে না, বাচ্চা বাঁচলে মা বাঁচবে না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কৃপায় মা ও মেয়ে দুজনই জীবিত থাকে। শুধু মেয়ে বর্ষা প্রতিবন্ধী হয়। মেয়ের নাম আগেই ঠিক করে রেখেছিল মুক্তা-দীপ দম্পতি।
মা-বাবার একমাত্র সন্তান দীপ। তার মা-বাবা প্রথম নাতনির মুখ দেখল। নাতনির জন্মের আগে বৌমার কত যত্ন-আত্তি। বৌমাও দেখতে রূপবতী। অহংকার নেই। বাড়ির কাজকর্মেও ভালো। কিন্তু শাশুড়ি বৌমার এমন প্রতিবন্ধী মাথা মোটা নাতনি জন্ম দেওয়ায় সন্তুষ্ট না। মুক্তার শ্বশুরও খুশি নন। তাঁরা দুজন ছেলেকে রাজি করাতে চেষ্টা করলেন এ বাচ্চা এতিমখানায় দিয়ে দেওয়ার জন্য। মা-বাবা তাকে বললেন, 'এ বাচ্চা আমাদের বংশের প্রথম প্রদীপ হতে পারে না। ওকে এতিমখানায় এখনই দিয়ে দাও। এই বাচ্চা থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো! শুধু শুধু কষ্ট। তোদের কষ্ট আমাদেরও কষ্ট। মানুষের সামনে কিভাবে নিয়ে যাবি এ বাচ্চাকে?' তার বাবা অনেক কথা শোনালেন দীপকে। দীপ এতিমখানায় দিয়ে দিল মেয়েকে। কিন্তু এ কথা শুধু দীপ ও তার মা-বাবা জানে। মুক্তাকে তখনো জানানো হয়নি। তাকে বলা হয়েছে বর্ষা মারা গেছে। এই কথা বলে খুব অভিনয় করেছিলেন মুক্তার শ্বশুর-শাশুড়ি। তাঁরা নাতনির শোকে হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন। কান্নাকাটির মাধ্যমে শেষ হয় তখনকার নাটক।
মুক্তা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে আসে। শুরু হয় নতুন জীবন। আবার আগের মতো সুখ তাদের জীবনে ফিরে আসতে থাকে। দুই বছর পর এক মাস আগে-পিছে দীপের মা-বাবা মারা যান। বাবা ছিলেন ডায়াবেটিসের রোগী আর মায়ের ছিল হার্টের সমস্যা। দীপ এর কিছুদিন পরই খবর পায় এতিমখানায় তার মেয়ে বর্ষাও মারা গেছে। দীপ সবার অজান্তে মেয়ের খোঁজখবর রাখত। মা-বাবার পর মেয়ের বিয়োগ-ব্যথা সে আর সহ্য করতে পারল না। শোকে পাথর হয়ে গেল। মুক্তা জিজ্ঞেস করল, 'তোমার কী হয়েছে? তুমি এমন হয়ে গেছ কেন?' দীপ সাহস করে প্রিয়তমা স্ত্রীকে বলল, 'আমি অনেক বড় পাপ করেছি। এই পাপের আগুনে গত দুটি বছর দাউ দাউ করে জ্বলেছি। আমি আর সহ্য করতে পারছি না মুক্তা।'
মুক্তা অভয় দিয়ে বলল, 'বলো কী হয়েছে?'
তার আগে বলো, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে?
স্বামীর হাত দুই হাতের মুঠো করে ধরে মুক্তা বলল, 'ঠিক আছে ক্ষমা করব।'
দীপ দুই বছর আগে বর্ষার মারা যাওয়ার মিথ্যা নাটকের কথা স্বীকার করল এবং বলল, 'আমাদের বর্ষা আজ মারা গেছে।' বিকেলে ওকে সমাহিত করা হবে। এমন কথা শুনে মুক্তা আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বামীর ওপর। প্রথমে স্বামীর গলা চেপে ধরে বলে, 'তুমি আমার বর্ষাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলে?' তারপর স্বামীকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে সে। তারা বিকেলে দেখতে যায় মেয়েকে। কাকতালীয়ভাবে সেদিনও ছিল আষাঢ়ের প্রথম দিন। মুক্তার মনে আছে, দুই বছর আগে যখন বলা হয়েছিল বর্ষা মারা গেছে কিন্তু লাশ তাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বাদে কোনো আত্মীয়স্বজনই বর্ষার মৃতদেহ দেখেনি। হাসপাতাল থেকে অন্য একটি মৃত বাচ্চা নিয়ে কবরস্থ করা হয়েছিল। পর পর তিনটি বর্ষা চলে গেছে। আজ চতুর্থ বর্ষা এলো। মুক্তার মেয়ের জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী একই দিনে। এই দিনটিতে সে দুটি কারণে কষ্ট পায়। অনেক কষ্টে একটি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম এবং সেই মেয়েটিকে নিয়ে তার স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির মিথ্যা নাটক। মুক্তা ভাবে, 'সবাই আমাকে ঠকিয়েছে। ঈশ্বর দিল এক প্রতিবন্ধী মেয়ে। সেই মেয়েকে নিয়েও নিকটাত্মীয়রা তাকে না জানিয়ে দিয়ে দিয়েছিল এতিমখানায়।'
সংসারে কাজকর্ম আর মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে এলো টেরই পায়নি মুক্তা। কলিং বেলটা বাজতেই দরজা খুলে দেখে হাস্যোজ্জ্বল দীপ। তার হাতে দিল একটি মেয়ে শিশুর ছবি। বলল, 'এই নাও। তোমাকে নতুন বর্ষাকে এনে দিলাম। ছবিটিকে নিজের মেয়ে মনে করে বুকে আঁকড়ে ধরে মুক্তা।'
পূর্বে প্রকাশ: কালের কন্ঠ















