শুক্রবার, ৬ মে, ২০১৬

বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা

ছোটদের গল্প
স্কুল থেকে ফিরেছে সবাই। আজ বৃহস্পতিবার। হাফ স্কুল। এগারটা বাজে। চয়ন, সুজন ও রতন একটা বুদ্ধি আটলো মাথায়। চয়ন স্কুল থেকে ফেরার পথে বন্ধুদের বললো, চল আজ আমরা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করি।
rain at village in Bangladesh, sumon corraya's story সুজন ও রতন রাজি হলো। তারা বাড়ি গিয়ে আরো সাথিদের রাজি করালো। পাড়া প্রতিবেশী ছেলে-মেয়ে মিলে দশ বারজন হলো। যারা ছোট, বয়স সাত কি আট তারা বুঝতে পারছে না কি করতে যাচ্ছে বড় ভাইয়েরা।


রতন নিঝুমকে বললো, নিঝুম তুমি কি গোসল করেছ? না করলে আস, আমরা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করবো। তারপর আমাদের সাথে গোসল করবে।
আট বছরের নিঝুম বললো, হ্যাঁ আমি গোসল করেছি। আবার গোসল করলে মা আমাকে মারবে।
নিঝুমদের মা এমনিতে খুব রাগী মহিলা। তাই রতন নিঝুমকে দলে ভেড়াতে আর বেশি উৎসাহ দেখালো না।
দুপুর বারটা বাজে। নাটোর শহর থেকে হারোয়া গ্রামটি বিশ কিলো মিটার দূরে। এই গ্রামের স্কুল পড়–য়া শিশু-কিশোর-কিশোরীরা আজ বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করবে। এই প্রার্থনা কোন মসজিদে-মন্দির বা গির্জা  গিয়ে প্রার্থনা নয়। এই প্রার্থনা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ পদ্ধতিতে। গানে গেয়ে।
পিয়ালদের বাড়িতে বড় একটা কুয়া আছে। সেখানে সবাই মিলিত হলো। দল নেতা চয়ন গান শুরু করলো, আল্লা মেঘ দে ছায়া দে দুই আল্লা পানি দে রে আল্লা মেঘ...
সবাই মিলে গানটা গায়। কুয়ার পাড়ে সবাই গড়া গড়ি করে। তাদের উপর পিয়ালের বাবা রহমান সাহেব কুয়া থেকে পানি তুলে ঢেলে দেয়। সবাই গলা ছেড়ে গান গায়। তাদের উপর পানি ঢেলে দিতে থাকেন রহমান সাহেব।
যে কেউ প্রাথমে দেখলে মনে করতে পারে ছেলে-মেয়েগুলো পাগল হয়ে গেছে। না হলে এভাবে কেউ কাদার মধ্যে গড়া গড়ি করে? কিন্তু না। হারোয়া গ্রামে ছেলে মেয়েরা চৈত্র-বৈশাখ মাসে এভাবেই বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করে। 
এ গ্রামে প্রায় শ’খানেক বাড়ি আছে। তারা সব বাড়িতে যাবে না। পনের বিশ বাড়িতে গিয়ে গান গায়, সেসব বাড়িতে তাদের উপর পানি ঢেলে দেয়। যারা গান গায় তাদের সবারই গায়ে কাদা মাটিতে মাখামাখি হয়ে যায়। তারা চেষ্টা করে যে যত বেশি কাদা গায়ে মাখতে। তাদের প্রতি বাড়ি থেকেই এক মুঠো চাউল দেয়। কেউ কেউ গান শুনে খুশি হয়ে সঙ্গে দুটা ডিম দেয়, কেউ সবজি বা ডাল দেয়।
গান শুনে নিঝুম ছুটে আসে। তারও খুব ইচ্ছে করে গান গাইতে। গান গাইতে গাইতে অন্যদের মত সারা গায়ে কাদা মেখে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে। 
নিঝুম দেখে অন্যান্য মানুষের মত তার মাও এসেছেন গান দেখতে। যেখানে রতনরা গান গায় সেখানেই পিছে পিছে আরো দশবারজন বড় মানুষ যান। ছোটদের বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা দেখেন তারা।
নিঝুমের মা চোখের ইশারা পেয়ে যোগ দেয় আল্লা মেঘ দে পানি দে ... গানের দলে। 
কৃষক আব্দুল হাইয়ের বাড়িতে গানের দল গেলে তিনি আবেগে কেঁদে ফেলেন । তিনি রতনকে জড়িয়ে ধরে বলেন, বাবা গান গাও, আল্লারে কও যেন বিষ্টি দেয়।
বর্গা চাষী আব্দুল হাইয়ের জমি শুকিয়ে গেছে। মেশিনে পানি দিয়ে কুলানো যাচ্ছে না। খড়ায় সেচ যন্ত্র দিয়ে পানি উঠাতে হিমশিম খাচ্ছে কৃষককুল।
রতনরা এক ঘন্টা বিভিন্ন বাড়িতে গান গায়। তারপর তারা বড় মিয়াদের পুকুরে গিয়ে গোসলে নামে। তাড়াতাড়ি গোসল সারে তারা।
গান গেয়ে তারা আড়াই তিন কেজি চাউল, বেশ কিছু সবজি, দুই হালি ডিম পেয়েছে। এখন এগুলো বড়মিয়াদের এই ঐতিহ্যবাহী পুকুড় পাড়ে রান্না করে খাবে। একটা ছোটখাটো চড়ইভাতির মত হয়ে যাবে।
সব বন্ধুরা মিলেমিশে রান্নার সারঞ্জাম সংগ্রহ করলো। কেউ আনলো হাড়িপাতিল, কেউ আনলো, তেল কেউ নুন।
রান্না প্রায় শেষ। সবাই কলা পাতায় ভাত বেড়ে খেতে বসেছে। তখনই দেখা গেল দক্ষিণ আকাশ কালো হয়ে গেছে।
সবার প্রায় খাওয়া শেষ তখনই নামলো বড় বড় ফোটায় চৈত্রের প্রথম ঢল। বৃষ্টিতে ভেজার আগেই কিশোর-কিশোরীরা মনের আনন্দে যে যার বাড়ির দিকে ছুটলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন