শুক্রবার, ৬ মে, ২০১৬

পথের সাথী

 উপন্যাস
সুমন কোড়াইয়ার উপন্যাস পথের সাথি

রাত দুপুর। চারিদিকে সুনসান। সেই কখন থেকে বসে আছি বাবা আসবেন বলে। রাত দশটার মধ্যে আসার কথা কিন্তু এখন রাত দু’টা বাজে। তিনি এখনো আসছেন না। আমাদের বাসাটা বড় রাস্তার অদূরে। তাই রাস্তায় গাড়ি গেলে শব্দ আসে। যখন দু’একটা রিক্সা বা গাড়ি যাওয়ার শব্দ শোনা যায় তখনই মনে হয় যেন বাবা আসছেন। আমি পড়ার টেবিল থেকে বিছানায় গিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিলাম। চোখে একটুও তন্দ্রা নেই। কেন জানি না।

 অন্যদিন রাত এগারটা না বাজতেই পড়ার সময় ঝিমুতে শুরু করি। বাবা বলেন, কি ঘুম ধরেছে? চোখে মুখে পানি দিয়ে পড়তে বস। আমি বাবার কথায় বাধ্য ছেলের মত টয়লেটে গিয়ে চোখ-মুখ ধুয়ে আসি। পড়তে বসি। অনেক কষ্টে কোন কোন দিন ঘুম দূর করে পড়া শেষ করি।
আজ পড়তে বসে তো পড়াও হলো না। বার বার দুশ্চিন্তা। মা আমাকে কত বলেন যেন দুশ্চিন্তা না করি, তবু দুশ্চিন্তা হয়। তিনি বলেন-আমার জন্যে তোর কোন চিন্তা করতে হবে না। আমি খুব তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যাবোরে বাবা। মাকে বলি, আমি তো তাই চাই মা, তুমি  তড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠ যেন আমরা আবার দল বেঁধে মামা বাড়ি যেতে পারি। মার খুব বড় ধরনে অসুখ করছে। ডাক্তারা বলেছেন, এটা নতুন ব্যাধি । এ দেশে এ রোগ ছয়জনের হয়ে ছিল। তারা সবাই মারা গেছে। শুধু মা’ই একজন ব্যক্তি যিনি এখনো মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বেঁচে আছেন। বাবা তার পিছনে টাকা ঢালতে ঢালতে প্রায় নিঃশ্ব হয়ে যাচ্ছেন। মাকে সুস্থ করতে জমি-জমা বিক্রি করেছেন এখনো  টাকার পিছনে ছুটছেন তাকে দেখে বুঝতে পারি যে তিনি আসলে মাকে কত ভালবাসেন। কখনো মনে হয় যে মা তাকে বাকি ছয়জনের মত বাঁচবে না। তাহলে বাবার এত কষ্ট করার কি দরকার? কেউ তো চায় না তার প্রিয়জন চোখের সামনে মরে যাক। মা মরে যাবে এটা ভাবতেই বুক মুচড়ে কান্না আসে। আমার মনটা খুব দুর্বল। মাকে হারাতে হবে ভাবতেই চোখে জল আসে । কখনো কখনো কল্পনা করি যে মা পরপারে চলে গেছে, মার শব দেহ কাঠের বাক্সে করে কবরে নিয়ে যাচ্ছি তখন দু’চোখ ছলছল করে কান্নায় ভরে যায়।
বাইরে বাবার জুতার আওয়াজ। তার চলা-ফেরা আমার অতি পরিচিত। আমার একুশ বছরের এই জীবনে বাবাকে আমি সবচেয়ে বেশি চিনি। নিজেকে না যতটা চিনি বাবাকে মনে হয় তার চেয়ে বেশি চিনি। বাবা দরজার সামনে এসে গলায় কাশির মত শব্দ করেন। এটা তার অভ্যাস। কোথাও থেকে ফিরলে বাসায় এলে তিনি এ রকম করেন।
দরজায় শব্দ হলো। দৌঁড়ে গিয়ে খুলে দিলাম। বাবা তার শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহটি নিয়ে ঘরে এলেন। এসেই জিজ্ঞাসা করলেন, কি সব কিছু ঠিক আছে?
জি
তুমি কেমন আছ? 
ভাল।
আপনি?
ভাল 
আর মা?
সে আর ভাল হলো কই?
কেন একটুও কমেনি। ঔষধে কোন কাজ হচ্ছে না?
ডাক্টার কিছু বুঝতে পারছেন না। ও ভাল কথা, তোমার মা তোমাকে দেখতে চেয়েছে।
এ সপ্তাহে আর কিভাবে। আজ শুক্রবার তো ছুটি ছিল। আগামী বৃহস্পতিবার যাবো। ঐ দিন তো বারটা পর্যন্ত অফিস। ঐদিন অফিসের পরে চলে যাবো। 
ঠিক আছে তাই করো।
বাবা হাত-মুখ ধোলে খেতে বসলাম। ভাত-তরকারি সব ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এটুকু গরম করলে ভাল হতো। কিচেনে গেলাম। ভাত তরকারি গরম করে এনে দু’জন খেতে বসলাম। খেয়েই দু’জনে শুয়ে পড়লাম। বাবা শুয়েই নাক ডাকতে শুরু করলেন। আমার আর তন্দ্র আসছে না। বার বার মার কথা মনে পডছে। আর পাতার মুখচ্ছবিও হৃদয়ে ভেসে উঠছে।
মা পাতাকে খুব পছন্দ করেন। পাশের গ্রামের মেয়ে পাতা। স্কুলে এক সাথে লেখা পড়াশুনা করেছি। এখন ঢাকায় পড়ি, সঙ্গে চাকরি করি। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে হিসাব বিভাগে কাজ আমার। পাতা গ্রামের বড়িতে পড়ালেখা করে। মার খুব শখ পাতাকে বউ করে ঘরে আনার। মার ইচ্ছা কোনদিন পূরণ হবে কিনা কে জানে। এদিকে তার শরীর যেভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে তা ভাবতেই কষ্ট হয়। মা কি আমাদের দু’জনকে এক বন্ধনে বেঁধে রেখে যেতে পারবেন? ঈশ্বরই জানে। এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, টেরই পেলাম না
বাবা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেন। তিনি অফিসে যাওয়ার আগে শুধু এককাপ চা পান করেন। ছয়টার ঘুম থেকে উঠে আমাকে জাগতে হয়। নাস্তা খেয়ে অফিসে আমিও দৌঁড় দেই। 
বিকেলে অফিস থেকে ফিরে বাসায় এলাম। পাশের বাসার তনুদি বললো যে আমার এক গেস্ট একটু আগে এসেছিল। আমি এক মুহূর্তে ভবলাম কে আসতে পারে। তনুদি বললো, তোমার মতনই একটি ছেলে-ফর্স লম্বা করে ছেলেটা। বুঝলাম হয় রুপক না হয় উৎপলদা এসেছে। দৌঁড়ে পাশের গলিতে গেলাম। গলির মোড়ে একটি চায়ের দোকান। গিয়ে দেখি আপন মনে সিগারেট টানছে উৎপলদা। সে আমাকে দেখে বললো-
 কিরে কেমন আছিস?
 ভাল। দু’জনে হ্যান্ডশ্যাক করলাম।
জিজ্ঞাসা করলাম, তোর খবর কি, ভাল? সব ভাল চলছে?
 হু। তোর?
 এই তো চলছে, বেঁচে আছি আর কি।
 মাসিমার শরীর কেমন?
 ভাল না। দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।
 আমি ঠিক করেছি যে মাসিমাকে দেখতে যাবো। রিপন ও রোকনের সাথে কথা হয়েছে, ওরাও তাঁকে দেখতে যেতে চায়।
 ভাল কথা। মা তোদের অনেক দিন দেখেন না। দেখলে খুব খুশি হবেন। আগামি বৃহস্পতিবার চল?
উৎপলদা সিগারেট টান দিয়ে ধোয়া ছেড়ে বললো, আগামী বৃহস্পতিবার মনে হয় যাওয়া হবে না। আমার সেদিন বিকালে ডিউটি করতে হবে। এছাড়া ঐ দিন রোকনও ঢাকার বাইরে থাকবে। ওর বোনের বাড়িতে যাবে।
 তা হলে  শুক্রবারে চল?
 হ্যাঁ, সিডিউল সবাকে নিয়ে করতে হবে।
তবে আমি খুশি হবো যদি বৃহস্পতিবারে সবাই যাই। অনেক দিন পরে বন্ধুরা মিলে গ্রামের বাড়িতে যাবো, একটা ছোট খাট পার্টিও হয়ে যাবে।
তা তো অবশ্যই।
তাহলে কথা থাকলো আগামী বৃহস্পতিবারের পরের বৃহস্পতিবার।
উৎপলদা একটু ভেবে বলে, ঠিক আছে। আমি ওদের সবাইকে জানিয়ে দেই। এখন রোকনকে জিজ্ঞাসা করি ঐ দিন আবার ওর কোন সিডিউল করা আছে নাকি।
সে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে রোকনকে জিজ্ঞাসা করলো, রোকন শোন এই বৃহস্পতিবারের পরের বৃহস্পতিবার বন্ধুরা সবায় মিলে গ্রামে যাচ্ছি। তুইও যাবি।
হঠাৎ জরুরি কি তলব?
হ্যাঁ, শোন তুহিনের মার, আমাদের প্রিয় মাসিমা খুব অসুস্থ, সকলে মিলে দেখতে যাবো। উনি নাকি আমাদের কথা খুব মনে করেন।
ঠিক আছে যাবো। কিন্তু তুই এখন কোথায় তুহিনের কাছে এসেছিস? 
ওর সাথে কথা বল।
উৎপলদা মোবাইলটা হাতে দিল। কিরে কেমন আছিস?
 ভাল। তুই?
 এই তো কোন রকম। 
মন খুব খারাপ মায়ের জন্য?
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, না। মাতো অনেক দিন থেকেই অসুস্থ।
তাহলে পাতার জন্য?
কেন? ওর জন্য শুধু শুধু মন খারাপ হবে কেন?
না হলেই ভাল। মেয়েদের জন্য মন খারাপ করে লাভ নাই দোস্ত। দেখিস না আমি কোন মেয়েকে পাত্তা দেই না। এই বয়সে প্রেম-ট্রেম ভাল না।
তাই নাকি। আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
তবে ওদের সাথে মেলামেশা  ভাল কিন্তু নির্দিষ্ট কারো প্রতি দুর্বল হওয়া ঠিক না।
আমি আর এ প্রসঙ্গে গেলাম না। বললাম, রাখি রে সময় পেলে বাসায় আসিস।
এই শোন উৎপলকে একটু দে কথা বলি।
না অনেকক্ষণ ধরে কথা হচ্ছে অনেক টাকা খরচ হয়ে  গেল রাখি।
লাইনটা কেটে দিলাম।
উৎপলদা জিজ্ঞাসা করলো, কি রোকন কিছু বলেছে?
বলেছে তোর সাথে নাকি কি কথা আছে।
সে মোবাইল টিপে দেখে নিলো কত টাকা খরচ হয়েছে। বললো, আর বিশ টাকা আছে।
চল বাসায় চল। নিজের হাতে কড়া করে চা খাওয়াবো।
কেন কষ্ট করবি। এখানেই খাই। এই মামু দু’কাপ চা দাও।
বললাম, না চা দিতে হবে না। বাসায় যাবো। দোকানি বললো, বাসায় তো যাইবেনই চা ডা খাইয়া যান।
ঠিক আছে, দেন। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম।
কাপে চুমুক দিয়ে উৎপলদা জিজ্ঞাসা করলো-সুমির খরব কি জানিস?
অবাক হয়ে বললাম, কি খবর?
কেন জানিস না ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
আরো অবাক হয়ে, তাই নাকি বলিস কি? বিশ্বাস হয় না।
বিয়ের কার্ড পেলে বিশ্বাস করবি?
হু।
পেয়ে যাবি খুব তাড়াতাড়ি।
হ্যাঁ, তা পাবো আর সেখানে বরের নাম লেখা থাকবে তোর নাম। সেই কার্ডটাই পাবো।
আরে বোকা না। ওর সঙ্গে আমাকে জড়াস কেন? ওখানে নাম থাকবে রুবেনের। একটা বিদেশী এনজিওতে চাকুরী করে। অবস্থা খুব ভাল।
এসব বলিস কি?
ঠিকই বলছি।
এটা কি মগের মুল্লুক? একজন উড়ে এসে শুধু জুড়ে বসলেই হলো। জানি না মেয়েদের মন বুঝা বড় কঠিন। কেন সুমি তো ঐ ধরনের মেয়ে না। তোর সঙ্গে এত দিনের বন্ধুত্ব । মন দেয়া নেয়া। আমি ঠিক হিসাব মেলাতে পারছি না।
কেন গত ছুটিতে যখন গ্রামে যাস তখন ওর সাথে শেষবারের মত কি কথা হয়।
কথা তেমন হয়নি তবে আজ মোবাইল করেছিল
কি? চিৎকার করে বলে ফেললাম।
হ্যাঁ, আর তার জন্যই তোর সঙ্গে দেখা করতে আসলাম।
তাই। কি কথা হয়েছে সে কথা আগে বলবি না। তুই না আসলে কি যে একটা আজব পাবলিক। চল বাসায় চল। ওখানে গিয়েই বলবি।
এখন আবার যাবো। দেরি হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
তা তো ফিরবিই। বাসায় চল শান্তি মত যা বলার তা বলবি।

***

দু’জনে বাসায় এলাম। উৎপলদা বিছানায় আমি চেয়ারটা টেনে ওর সামনে বসলাম। উৎপলদা বললো, সুমি বিয়েতে তোদের সবায়কে দাওয়াত করেছে?
আর তোকে নিমন্ত্রণ করেনি।
করেছে।
উৎপলদা আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।
তোর বিশ্বাস না হলে আমি কি করবো।
তার পর সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। তার নেত্রদ্বয় ছল ছল করছে। ভিতরে ভিতরে সে খুব কাঁদছে। তার মধ্যে অনেক ঝড় হচ্ছে। সব উলট পালট হচ্ছে। আমি তার মুখের একাংশ দেখেই তা বুঝতে পারি। কিন্তু এ মুহূতে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মত ভাষা আমার  জানা নাই। সে নীরব। আমিও নীবব। এই স্তব্ধতায় বইতে থাকে বিরহের ধারা। আমি তার কাছে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলাম। পিঠে হাত রেখে বললাম, ভেঙ্গে পড়িস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা তো আছি।
উৎপলদা তখনো বাইরের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। বুঝতে পারলাম সে নীরবে কাঁদছে। উঠে কিচেনের দিকে পা বাড়ালাম। যাওয়ার সময় বিড় বিড় করে বললাম, দেখি কি কি রাধতে হবে। কিচেনে এসে হাড়ি পাতিল খামোকো দেখছি। কোন কাজ নেই। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। বাড়ি থেকে বাবা এক বৈয়াম আমের আচার এনেছেন। মায়ের তৈরি। উৎপলদার টক খুব প্রিয়। বাবারও প্রিয়। আমার আবার টকের কথা শুনলেই গা কেমন শির শির করে।
 উৎপলদার কাছে ফিরে আসলাম। বললাম, উৎপলদা বাবা আমের আচার এনেছেন। এখন খেচুরি করি, আচার দিয়ে খেয়ে যাবে।
না, কিচ্ছু রাধতে হবে না। আমি এখন উঠি।
 না উৎপলদা এখন যেও না।
তখন সে বললো, না ফিরতে হবে। হোস্টেলে বলে আসিনি।
ফোন করে দাও!
তার প্রয়োজন নেই। ফিরতেই হবে। 
বাব্বা, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছ। হোস্টেলে গিয়ে কি করবে? 
হোস্টেলে একটা মিটিং আছে।
ও তাই। তাহলে আচার খেয়ে যা।
না, আরেকদিন এসে খাবো।
আমি আচার আনতে কিচেনে চলে গেলাম। পিরিচে ওর জন্য আচার নিয়ে আসলাম।
বললাম, নাও নাও।
না, তোকে নিয়ে আর পারা গেল না। 
খাও খাও প্রিয় খাদ্য। তুমি না খেলে কে এত আচার খাবে বল। খেয়ে শেষ করতে হবে না?
উৎপলদাকে আমি কখনো কখনো তুই বলি, আবার কখনো তুমি করে বলি। সেও বলে।
উৎপলদা চলে গেল। আমার মনটাও খুব খারাপ। ভেবেছিলাম আজ থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত পড়বো। কিন্তু মনটা বিষণœতায় ভরে গেল। কিন্তু কেন? সুমির বিয়ের কথা বার্তা পাকাপাকি হচ্ছে বলে? সে আমার কে? আমাদের গ্রামের প্রতিবেশী। তবুও আমার মন খারাপ হয়ে গেল। সুখ, দুঃখ জিনিসটা দেখা না গেলেও ভাগ করা যায়। উৎপলদার দুঃখের ছিটে ফুটা হয়ত আমার হৃদয়েও এসে পড়েছে। তাই আমার এমন লাগছে।
কিন্তু আমি তো ভালভাসি পাতাকে। ওর কথা আমার মনে হচ্ছে না কেন? ওর সাথে আমার সম্পর্ক তো প্রায় ছাড়া ছাড়া। এক মাস ধরে ওর সাথে কোন যোগাযোগ নেই। ওকে মোবাইলও করা হয় না। আছে হয়ত ভালই। বড় করে নিঃশ্বাস ফেলি।
পড়ার টেবিলে বসি। কোন বইটা পড়বো ভেবে পাচ্ছি না। বক্স থেবে চিঠির প্যাকেটটা বের করি। আমি এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করছি। গ্রাম থেকে মা চিঠি লেখেন। তাঁর চিঠিগুলো সংগ্রহ করে রাখি। অনেকের চিঠি পাই। আগেও পাতাও মাসে মামে চিঠি লিখতো। এখন অবশ্য বছরে দু’একটা লেখে। তার ও মার চিঠিগুলো শুধু আমি সংগ্রহ করে রাখি।
মায়ের চিঠি লেখার হাত খুব ভাল। খুব সুন্দর করে মুক্তার মত গুটি গুটি করে লেখেন। একবার পড়লে আরেকবার পড়তে ইচ্ছে করে। তাঁর চিঠিতে উপদেশের আকারে অনুপ্রেরণা ও প্রশংসা ভরপুর থাকে। আর পাতা। সে সত্যি একটি সবুজ পাতা হয়ে আমার হৃদয়ে ভাসছে। প্রথম প্রথম সে খুব বড় করে চিঠি লিখতো। ক্রমে তার চিঠি ছোট হয়ে আসে। কিন্তু ছোট চিঠির শব্দগুলোরও শক্তি অনেক বড় চিঠির চেয়ে বেশি। ‘তোমার ভালবাসায়
ভাল আছি
তুমি ভাল থেকে
ইতি- পাতা।’

***


পাতাকে খুব ছোট কাল থেকে চিনি। পাশের গ্রামে ওদের বাড়ি। ওদের বাড়ির কাছ দিয়ে চলে গেছে শহরে যাওয়ার মেঠে রাস্তা। স্কুলেও যেতাম ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে। আমাদের বাড়ি প্রত্যন্ত গ্রামে। বিলের পাশে। বর্ষায় আমাদের বিলে পাতা ও ওদের গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা সাঁতার কাটতে আসতো। মাছ ধরতো। আমাদের গ্রামের একদল ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে যেতাম বিলে হৈ চৈ করে খেলা ধূলা করতে। শৈশব কৈশরের বাড়তি আনন্দটুকু পেতাম বিলের সাদা অথৈয় পানিতে সাঁতার কেটে মাছ ধরে। ঠিক তখনো পাতাকে আমার চোখে, হৃদয়ে আবিষ্কার করতে পারিনি। ওকে তখন খুব সাধারণই মনে করতাম। সে তখন আমার পাশ দিয়ে চলে গেলেও ওর দিকে তাকাতাম না। কোন রকম লাগতো না সেই সময় একটুও মনে হয়নি যে ওর মত একটি সহজ সরল মেয়েকে ভালবাসবো।
ওকে ভাল লাগতে শুরু হয় স্কুল জীবনের শেষের দিকে। আমার চেয়ে দুই ক্লাশ নিচে পড়ে সে। তাই আমাকে বেশ সমিহ করে কথা বলে। বয়স যখন সোল কি সতের তখন ওর দিকে আমার নজর পড়ে। আমি তখন কিশোর। সে কিশোরী। আমাদের বয়োসন্ধিকাল । একদিকে স্কুলে ভাল ছাত্র, আবার আবৃত্তি, রচনা লেখা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন এই সব কারণে ছোটরা আমাকে বেশ সমিহ করতো। পাতাও তাদের দলে। ও আমাকে অনেক সার্পোটও দেয়। বলে তোমার ঐ আবৃত্তিটা বা ঐ রচনা, গল্প লেখাটা খুব ভাল লেগেছে। তার সাথে দেখা হলেই স্মিত হেসে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছো? আমি জিজ্ঞাস করলে সে আবার পবিত্র নির্মল হেসে বলে, ভাল।
ওর সাথে দেখা হলে আমার খুব ভাল লাগে, মনে হতে থাকে স্বর্গ পাই। চাই বার বার যেন ওর সাথে দেখা হয়। ওর কাছে ছুটে যাই। ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে বাজারে যাওয়ার রাস্তা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সে দিক দিয়ে যাই। তখন দেখলে বাড়ি থেকে ডাক দেয়। বার বার দেখা করি। এক সময় ভাবি ওর কাছে আমি কেন এত যাবো। সে কি আসতে পারে না? এই চিন্তা করে একবার আমি আর যাই না। এক দুই দিন পরে সত্যি সত্যি সে আমাদের বাড়িতে আসে। খোঁজ নেয় আমি অসুস্থ কিনা। বিকালে ওদের বাড়ির কাছ দিয়ে না গেলে সে আমাদের বাড়ির রাস্তায় হাঁটতে আসে। দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখে বুঝি আমার জন্য তার একটু হলেও  টান আছে।
ব্যপারটা পুরোপুরি বুঝতে পারি যখন এসএসসিতে ভাল রেজাল্ট করলাম। এবং তারপর পড়াশোন করার জন্য শহরে চলে আসবো তখন। যখন তাদের বাড়ির কাছ দিয়ে শহরে চলে আসছিলাম তখন তার মনটা কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। আমিও তাকে প্রতিদিন দেখতে পারবো না বলে মন খারাপ করে ঢাকায় চলে আসি। এখন তার সাথে বছরে দু তিনবার দেখা হয়। প্রকৃতি আমাকে আর পাতাকে কৌশরের সোনা ঝরা দিনগুলিতে খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে- আমাদেরকে এক সঙ্গে পরস্পরকে দেখতে দেয়, শরতের আকাশের নিচে দু’জনকে হাঁটতে দেয়। প্রাণ খোলে গল্প করতে দেয়। তার চোখে আমি কি যে খোঁজে পাই জানি না। শুধু তাকে ভাললাগে, ভালবেসে ফেলি। সেও আমার দিকে অপলক চেয়ে থাকে। মুখে কিছু বলে না। শুধু তার মুগ্ধ মুখ আমি পড়ে বুঝতে পারি যে সেও আমার খুব কাছে থাকতে চায়। তাই প্রথম দিন ঢাকা আসার সময় তার মন এত খারাপ দেখি।

***

বাবা অফিস থেকে আসলেন রাত এগারটায়। তার ডিউটি চারটা পর্যন্ত। তারপর ওভারটাইম করলে রাত দশটার মধ্যে বাসায় ফিরেন। কিন্তু আজ এলেন এগারটায়। কেনাকাটাও ছিল না। কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাস করলাম, বাবা এত দেরি হলো যে আজ?
আমেরিকান এম্ব্যাসিতে গিয়েছিলাম।
কেন?
তোমার মার ব্যাপারে। দেখি আমেরিকা নিয়ে কিছু করা যায় কিনা।
আমার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল। বললাম, ঐ দেশে বুঝি মার রোগের ভাল চিকিৎসা হয়?
ইসাহাক সাহেব তো তাই বললেন। ঐ দেশে  নাকি এরোগ সরানো যাবে।
তাহলে যা করার তাড়াতাড়ি কর।
হ্যাঁ তা তো করছিই। সারা দিন অফিস, আবার ওভার টাইম করে আর এনার্জি থাকে না। বয়সও হয়ে আসছে। আগের মত আর শরীর চলে না।
কোথায় কোথায় যেতে হবে কি করতে হবে বলবেন আমি তো আছি।
তোমার পড়াশোনা আছে না? তুমি পড়তে থাক। সময় নষ্ট করতে হবে না।
রাত দুটা পর্যন্ত পড়াশোনা করলাম। সারাদিন পড়াশোনা হয় না। তাই রাতেই পড়ি। এছাড়া দিনভর খুব ব্যস্তছিলাম। তাই রাতে একটু বেশি ঘুমিয়ে ফেলি। ঘুম থেকে উঠে দেখি আটটা বেজে গেছে। কিচেনে তনুদির রান্না করছে। হাড়ি পাতিলের এবং হাতের চুড়ির টুনটান শব্দ ভেসে আসছে।
নয়টায় অফিসে যেতে হবে। এর আগে অনেক কাজ। সব চেয়ে বড় কথা এখন রাধবো কোথায়? দুটা মাত্র চুলা। দুটার মধ্যেই তনুদি রাধছে। সাতটা থেকে আটর মধ্যে আমাকে রেধে শেষ করতে হয়। তনুদিরা আটটা থেকে তাদের সকালের নাস্তা রাধে, এখন কি করি?
দোকানে নাস্তা করা যায় কিন্তু দুপুরের জন্য রাধবে কে? আমি তো দুপুরে খাবার প্রস্তুত করে অফিসে যাই। কিন্তু এখন তা কি করে সম্ভব?
বাইরে থেকে নাস্তা এনে খেলাম। তনুদি একবার উৎসুখ চোখে এ ঘরে উঁকি দিয়ে গেল। সে খুব কম কথা বলে। খায়ও কম কিন্তু ঘুমায় বেশি। তার স্বামী গ্রামীণ ফোন কোম্পানিতে চাকুরি করে। ড্রাইভার। ভোর ছটা সময় বেরিয়ে যায় সুজিতদা। ফিরে রাত দশটা এগারটায়। কখনো কখনো ফিরে না। ফিরে এক সপ্তাহ বা পনের দিন পরে। অফিস থেকে গাড়ি নিয়ে টোরে যায়। তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ খুব একটা হয় না।
তনুদিকে অনেক সময় বাজার করে দিতে হয়। সে রাজশাহীর মানুষ। মাত্র ছ’ মাস হলো ঢাকায় এসেছে। প্রথমেই আমাদের সাথে সাবলেট ভাড়া থাকছে।
সুজিতদা আমাদের খুব বিশ্বাস করে। বাবার সাথে তার খুব ভাল সম্পর্ক। বাবা যখন রাজশাহীতে চাকরী করতেন তখন সুজিতদার সাথে তার কিভাবে যেন পরিচয় হয়। ঢাকায় সুজিতদা একমাত্র আমার বাবাকেই ভাল করে চিনতো তাই আমাদের সাথে বাসা ভাড়া নেয়। আমি অফিসে যাবো সে মুহূর্তে তনুদি আসলো। বললো, আজ এত দেরি করলে ঘুম থেকে উঠতে?
হ্যাঁ দেরি হয়ে গেল।
তোমার জন্য কিছু রাধতে হবে?
নাহ। মানে তুমি শুধু শুধু কষ্ট করবে কেন?
কেন আমি তোমার দিদি না? এত সুন্দর করে দিদি ডাক। এই ডাকের কি কোন মূল্য নেই।
ঠিক আছে এক পট্ চাল সিদ্ধ করে রেখো। আমি ফিরে এসে ডিম ভেজে ভাত খেয়ে নিবো। তনুদির  কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলাম। চলে আসছি তখন সে ডাক দিলো, এই শোন তুহিন। দাঁড়ালাম। ফিরে গেলাম দরজার কাছে। সে বললো, আমার জন্য অফিস থেকে আসার সময় ঔষুধ এনে দিবে।
কি ঔষুধ?
একটু দাঁড়াও। ঘর থেকে একটা কাগজ এনে দিলো। ঔষুধের নাম লেখা আছে। সঙ্গে টাকা দিলো। অফিসে চলে গেলাম।
তিনটার দিকে অফিস থেকে ফিরলাম। এসে দেখি তনুদির অবস্থা খুব খারাপ। পাশের বাসার কাজের মেয়েটি আমাদের বাসায় কোন দরকারে আসে, তখন দেখে তনুদি পেট ব্যথায় অস্থির। প্রায় বমি করে সে। বুঝতাম যে নতুন মানুষের আগমন হবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে আগমনের সময় হবে তা কে জানতো? আমি পুরুষ মানুষ। তার সমস্যা কি তা বুঝতে পারছিলাম না। সুজিতদাকে ফোন করলাম তার মোবাইলে। সে শুনে পাগলের মত হয়ে গেল। আধ ঘন্টার মধ্যে ফিরে আসলো। আমি ট্যাক্সি ক্যাব ডেকে এনে বাসার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। সুজিতদা এসেই তনুদিকে হলিফ্যামিলিতে নিয়ে গেল। সঙ্গে আমি গেলাম। সহজে ভর্তি করা যাচ্ছিল না। ওখানে আমার এক বন্ধুর মা বড় নার্স। তার সাথে হঠাৎ দেখা। তিনিই রোগীর অবস্থা দেখে নিজে ব্যবস্থা করে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

***

হঠাৎ পেটে কামড় দিয়ে ক্ষুধা লাগে। দুপুরে যে কিছু খাওয়া হয়নি তনুদির অবস্থা দেখে খেতে ভুলে গিয়েছিলাম। তারও কিছু খাওয়া হয়নি হয়ত। সুজিতদাকে বললাম, দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসি। সে বললো, আমি খেয়েছি। তোমার আপার জন্য এবং তোমার জন্য নিয়ে এসো। পকেট থেকে একশত টাকার নোট বের করে দিতে লাগলো। আমি না নিয়ে বললাম, না লাগবে না। আমার কাছে আছে। সে প্রায় জোর করে আমার পকেটে টাকা ভরে দিতে লাগলো। আমি না নিয়ে জোর করে বেরিয়ে এলাম হাসপাতাল থেকে।
হোটেলে এসে ভাত খেলাম। ফলের দোকান থেকে তনুদির জন্য ফল নিলাম। হাসপাতলে ফিরে দেখি সুজিতদা আল্লাকে ডাকছে। তাকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। খুব ছটফট করছে সে। ইতিমধ্যে তনুদিকে এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে। আরেক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হচ্ছে। আরো লাগবে। রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। সুজিতদা এ মুহূর্তে তনুদির কাছে কাকে রেখে যাবে, কি করবে তা ভেবে পাচ্ছে না। তার চোখ লাল হয়ে গেছে। মাথার চুল এলো মেলো। আমাকে সে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, তুমি হাসপাতালেই থাক। আমি টাকার ব্যবস্থা করছি। ডাক্তারকে বলা আছে। যা যা  লাগে সব ব্যবস্থা করতে। এছাড়া রূপকের মা, যাকে মাসি ডাকি। তিনি তনুদির প্রতি অনেক করছেন।
আমি ওয়েটিং রুমে বসে আছি। বাবাকে মোবাইলে জানালাম তনুদির অবস্থা খারাপ। ডেলিভারি হবে। এখন হলিফ্যামিলিতে আছি। বাবা বলেন, ডিউটি শেষ করে এদিক দিয়ে ফিরবেন।
আধা ঘন্টা পরে নার্স মাসিমা আমাকে ডাকলেন। বললেন, রক্ত দিতে হবে। আমার রক্তের সাথে তনুদির রক্তের গ্র“পের মিল নেই। কিন্তু বাবার মিল আছে। অবশ্য বাবার ডিউটি শেষ হয়ে গেছে। আজ হয়ত তিনি ওভার টাইম না করে ফিরবেন। হলোও তাই। ছটর দিকে বাবা হাসপাতালে এলেন। রক্ত দিলেন।
সুজিতদা অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন টাকা পয়সার জন্য। বাবাকে দেখলাম বার বার ঈশ্বরের নাম নিতে। তিনি পকেট থেকে রোজারি মালা বের করে মনে মনে জপতে জপতে বাসায় চলে গেলেন।
আমিও মনে প্রাণে তনুদির জন্য প্রার্থনা করছিলাম। যেন তার কষ্ট কম হয় এবং সব কিছু সুন্দরভাবে হয়।
অনেক ধৈয্য, প্রার্থনা ও ত্যাগ তিতিক্ষার পর পৃথিবীতে একজন নতুন মানুষ এলা। চাঁদের মত একটা ফুট ফুটে সন্তান তনুদির কোলে আসলো। সুজিতদাও টাকা পয়সা নিয়ে ফিরে এলো। সে খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে। অনেকক্ষণ ধরে রাখে। আল্লাকে ধন্যবাদ দেয়ে। আমিও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেই। সুজিতদা ছেলের শুধু কান্না শোনেছে, ছেলেকে না দেখেই বললো, আমি আগে আযান দিবো। প্রথমবারের মত জনক হয়েছি। আল্লাকে হাজার কোটি বার সুকরিয়া জানাই। এই বলে সে আযান দিতে চলে গেল।

***

বৃহস্পতিবার। বেলা দুটা। আমরা পাঁচবন্ধু নদ্দা বাসস্যান্ড থেকে এনপি এলিগেন্স কোচে উঠলাম। নগরীর বুক চিরে ইয়ারপোর্ট রোড পার হয়ে আবদুল্লাহপুর দিয়ে চলতে লাগলাম। গাজিপুর, টাঙ্গাইল দিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধ সেতু পার হয়ে সোজা সিরাজগঞ্জের রোড ধরে চলতে চলতে চলন বিলের বুক চিরে এগুতে লাগলাম। চলন বিলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। দু পাশে তাকালে মনে হয় দীপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। দু’পাশে শুধু সাদা পানি। বিকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ নাটোর গিয়ে পৌঁছলাম। নাটোর শহর থেকে যার যার গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম। আমার সব বন্ধুর বাড়ি পাশাপাশি গ্রামে। কথা হলো পরের দিন শুক্রবার সবায় আমাদের বাড়িতে আসবে। রাতে থাকবে।
বাড়িতে পা রাখতেই কাজের মেয়েটা আমাকে দেখলো। মাকে গিয়ে দৌড়ে বললো। মা শোয়া থেকে উঠতে উঠেত বললেন, কই বাবা তুহিন? 
এই যে মা আমি এসে গেছি। কেমন আছ মা তুমি? 
ভাল বাবা, তুই ভাল তো?
হ্যাঁ
তোর বাবার খবর কি?
ভাল আছেন। ঐদিন ভালভাবেই ঢাকায় ফিরেছিলেন। তুমি ঔষধ ঠিকমত খাচ্ছ তো?
হু।
ময়না এদিকে আয়। তোর খবর কি?
ভাল দাদা। আপনি কেমন আছেন? 
ভাল। মাকে সেবা যতœ করা হয়ত ঠিক মত?
জি।
নাকি শুধু সাজুগুজু নিয়ে ব্যস্ত থাকিস। ময়না হাসে। ওর চেহারায় মায়া আছে। খুব সহজ সরল মেয়ে ও । টিপ ওর খুব পছন্দের। সাজার জিনিসের মধ্যে সে টিপ সব সময় পরে। লম্বাটে মুখটায় ওকে টিপ খুব মানায়। সময় পেলেই টিপ পরে বসে থাকে আয়নার সামনে। আমি আমার ঘরে যাই। ময়না দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, কিছু লাগবো? লাগলে বইলেন।
হ্যাঁ লাগবে। পাতার খবর লাগবে।
 ও তার কথা। সে তো ভালই আছে। প্রতিদিন কলেজে যায়। আমার সাথে অবশ্য এই কয়দিন কথা হয় নাই। মাসখানেক আগে কথা অইছে। তখন জিজ্ঞাসা করছিল, আপনে কবে আইবেন।
ও তাই।
কিছু বলতে অইবো তারে? কোন খবর থাকলে কন্। গোপনে যামু । গোপনে আহুম। কাক পক্ষিও টের পাইবো না।
না কোন খবর নেই। তোকে যেতে হবে না। শোন ওর কথা যে তোকে বলেছি  এ কথা আবার মার কানে দিস্ না।
কি যে কন্ তবা তবা। আমি কি কোনদিন কইছি?
ধর। ভালভাবে সব কাজ কর্ম করবি। 
ময়না টাকার নোটটা নিয়ে কেটে পড়ে।
ময়না আমাদের গ্রামেরই মুসলিম পরিবারের মেয়ে। ওর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সংসার টিকেনি। তিনমাস সংসার করার পর ওর স্বামী ওকে তাড়িয়ে দেয়। নগদ বিশ হাজার টাকা বিয়ের সময় দেওয়ার কথা ছিল। ওর গরিব পিতা টাকার ব্যবস্থা করতো পারেনি। তাই ওকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। ময়নার বাবা প্রতিবন্ধী, এক পা নেই তবু কাজ কর্ম করেন। ঘরে বসে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন কুটির শিল্পের কাজ করেন। কিন্তু তিন মেয়েকে নিয়ে চলা তার অনেক কষ্টকর। তার ছেলের খুব সখ ছিল কিন্তু তার ঘরে ছেলে সন্তান হয়নি। আশায় পথ চেয়ে থাকে কবে ওর স্বামী ওকে নিতে আসবে। ওর শশুরই নাকি যৌতুকের টাকাটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। উঠকে বসতে টাকার খোটা দেয়। শাশুড়িও কম যায় না। ছেলেও বৌ গরিব ঘরের বলে আদর কম। যৌতুকের টাকাটা না পাওয়াতে আরো বেশি খারাপ আচরণ করে।
øান করলাম। আমাদের বাড়িতে খুব পুরাতন একাটা কূয়া আছে। øান করার জন্য পানি ব্যবহার করা হয়। পানি খুব স্বচ্ছ। মা প্রতিদিন কূয়ার পানিতে øান করেন। মার বিছানার কাছে বসলাম। তিনি উঠে হেলান দিয়ে বসলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তোর পড়াশুনা ঠিক মত হচ্ছে তো?
হ্যাঁ মা হচ্ছে। তোমাকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়া হবে। আমি আর বাবা কাগজপত্র নিয়ে দৌড়দৌড়ি করছি।
বলিস কি! আমেরিকা। সে তো অনেক দূর। কিভাবে যাবো রে? এত টাকা কোথা থেকে পাবি তোরা?
লাগুক, তুমি আমার মা, লক্ষ্মী মা। তোমার জন্য যা করার সব করবো।
তোর বাবা গত ছুটিতে এসে বিলের নামায় ধানি জমির দাগটা বিক্রির কথা পিটার কাকাকে বলে গেছে। কিন্তু জমি বিক্রি করলে তোর ভবিষ্যতে সমস্য হবে। চাল কিনে খেতে হবে। আর এ রকম আবদি জমি বিক্রি করে কেউ? তোদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
হ্যাঁ মা তোমার এমন শক্ত অসুখ করেছে। আর আমাদের মাথা খারাপ হবে না? তোমার কিছু হলে মা আমি কি নিয়ে বাঁচবো, কাকে মা ডাকবো। বাবার কি হবে?
তোর বাবা আরেকটা বিয়ে করবে।
ছি মা! কি যে বল।
মা নীরব হয়ে যান।
শোন মা। সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমাকে রোগ হতে মুক্ত করবো। অকালে তোমাকে ঝরে যেতে দিবো না। আর শোন, আগামীকাল বন্ধুরা আসবে। আমি রেনু পিসিকে সকালে গিয়ে নিয়ে আসবো। তোমাকে এসে দেখে যাবে এবং রান্নাটাও করে দিবে।
তোর পিসিরা তো ভীষণ অসন্তুষ্ট।
কেন?
আমার পিছনে এত টাকা পয়সা খরচ করছে তোর বাবা। আমি সুস্থ হচ্ছি না । জমি জমা বেচে শেষ করে দিচ্ছে তাও ভাল হচ্ছি না। তোর পিসিরা আগে জমির ভাগ নিতে চায়নি। এখন মনে হয় নিতে চাচ্ছে।
তোমাকে কে বলেছে মা?
এগুলো আবার বলতে হয়? মানুষের কথা বার্তা আচার আচরণ দেখেই তো বুঝা যায়।
নিতে চাইলে নিবে। বাবা বা আমি তো আর বলিনি যে আমরা জমির ভাগ দিবো না।
একবার সব পিসিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তারা জমির ভাগ নিবে কিনা। তখন কেউ জমির ভাগ নিবে না বলেছে।
মা বললেন, মানুষের মন পরিবর্তন হতে কতক্ষণ বল? তার সাথে গল্প করে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ি।

***

পরের দিন সকালে বন্ধুরা এসে হাজির। আমাদের বাড়িতে মানুষ মোটে তিনজন। কিন্তু বাড়িটা বেশ বড়। বন্ধুরা এসে হৈ চৈ করলেই যেন বাড়িটা ভরপুর বলে মনে হয়।
সকালে রেনু পিসিকে আনা হয়েছে। চার পিসির মধ্যে শুধু রেনু পিসিই বাড়ির কাছে বিয়ে হয়েছে। তার বাড়ি আমাদেরই গ্রামে। তাছাড়া অন্য দুই পিসির বাড়ি অনেক দূর দূর। বাসে বা ট্রেনে যেতে হয়।
রেনু পিসি রান্না শুরু করলেন। বন্ধুরা মার সাথে দেখা করে। গল্প করে অনেকক্ষণ । সব বন্ধুরা গিয়ে পুকুরের ধারে বসলাম। পুকুরে অনেক মাছ। উৎপলদার আবার মাছ ধরার খুব সখ। ও বললো মাছ ধরবে। তাই বাড়ি থেকে বড়শি ও আটা নিয়ে আসলাম। উৎপলদা একটু দূরে সরে গিয়ে বসলো মাছ ধরতে। আমরা চারজন এক সঙ্গে বসে আড্ড দিচ্ছি। একটু পর পর উৎপলদাকে ডেকে জিজ্ঞেসা করি দু একটা মাছ ধরেছে কিনা। তার না বোধক উত্তর আসে।
প্রায় আধা ঘন্টা বসে থেকে একটা মাছ ওর বড়শি খেলো না। রূপক আর রোকন উৎপলদাকে বললো, মাছ ধরতে হবে না। চল নারিকেল গাছে উঠে ডাব খাই। রূপকটা আবার খুব গাছে উঠতে পরে। আমি রূপককে বললাম, দেখিস গাছ থেকে আবার পড়িস না। তখন তোকে নিয়েই টাানটানি করতে হবে।
উৎপলদা বলছে সে আরেকটু অপেক্ষা করবে মাছ ধরার জন্য, আমরা বাড়ির পশ্চিম দিকে চলে আসি। পুকুরটা পূব দিকে। রূপক এক বাদা সড়শ কচি ডাব গাছ থেকে নামায়। কিশোর উৎপলদাকে ডাব খাওয়ার জন্য ডাকতে যাবে তখন দেখে উৎপলদা নিজেই হেটে আসছে সঙ্গে সুমিও আছে। আমি ওকে বললাম, তুই শেষ পর্যন্ত মাছ ধরলি। তাও আবার দু’পেয়ো মাছ,  সেকি মৎস্য কন্যা। সুমি বললো, হ্যাঁ আমি মৎস্য কন্যা। আমরা সবাই হেসে দিলাম। সুমিদের বাড়ি আমাদের গ্রামেই। পাতা আর সে বান্ধবী। সুমি আমার মাকে দেখতে এসেছে। পুকুর পাড়ে উৎপলদার সাথে প্রথম দেখা। আমি বললাম, সুমি তুই কিন্তু আজ দুপুরে খেয়ে যাবি। সে বললো, না বাড়িতে বলে আসি নাই আর যদি বাবা জানে তোরা সবায় গ্রামে এবং এই বাড়িতেই আছিস আর আমি এখানে অবস্থান করছি তাহলে আমার আর রক্ষা নাই। আমি বললাম, তাহলে মার সাথে তাড়াতাড়ি দেখা করে উৎপলদাকে একটু সময় দে।
সুমি মার সাথে দেখা করতে ঘরে চলে যায়। আমরা কচি ডাব তৃপ্তি সহ খেতে থাকি। মার জন্য কচি নারকেল তুলে রাখি। ময়নাকে বলি নারিকেলের ভর্তা তৈরি করতে। গরুর মাংস দিয়ে নারকের রান্না করলেন রেনু পিসি।
নারকেল আর ডাবের পানি খেয়ে পুকুরে øানে নেমে পড়লাম। উৎপলদা আর সুমিকে আমার ঘর ছেড়ে দিলাম তাদের গল্প করারা জন্য। এদিকে চার বন্ধু পুকুরে আধা ঘন্টা সাঁতার কাটলাম, øান করলাম। আমরা গ্রামে এলে আবার শৈশবের মত আনন্দ করি। পুকুরে ডুবাডুবি করে সবারই ছোখ রক্তের মত লাল হয়ে গেছে। উৎপলদার গল্প এখনো শেষ হয়নি। গোসল  সেরে আমরা বাড়ি ফিরলাম।
আমি ঘরে ঢোকার জন্য বাইরে থেকে অনুমতি নিলাম। অনুমতি পেয়ে ডুকে দেখি উৎপলদা সিগারেট হাতে, উদাস হয়ে বসে আছে। সুমির চোখ লাল, এতক্ষণ হয়ত কেঁদেছে। দু’জনই নীরব। ঘর থেকে আয়না চিরনী বের করলাম। ওরাও একটা পরে ঘর থেকে বের হলো। সুমিকে বললাম দুপুরে খেয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু রাজি হলো না।
সুমি যেভাবে চলে গেল তাতে মনে হলো আবহওয়া বার্তা খারাপ। তাই আমরা সে সময় আর কেউ উৎপলদাকে ঘাটালাম না। তাকে শুধু আমি বললাম, øানটা সেরে এসো। সে বললো, এখন আর গোসল করবে না। সকালে করে এসেছে । রেনু পিসির রান্না বান্না প্রায় শেষের দিকে। মাকে ভাত দিয়েছেন। ময়না মাকে ভাত খাওয়াচ্ছে।
সবাই আমরা ঘরে গিয়ে বসলাম।
কিশোর বললো, দোস্ত সত্যি আমি আজ খুব আনন্দিত। কিন্তু উৎপলদাকে দেখে আমার খুব দুঃখ হয়।
রোকন বললো, কেন?
দেখছিস না বেচেরা কেমন ঝিম মেরে গেছে।
এবার উৎপলদা মুখ খোললো, আমাকে নিয়ে তোর এত ভাবতে হবে না। তুই বরং নিজেকে নিয়েই ভাব।
রোকন বললো, ঠিক বলেছিস। অন্যদেরকে নিয়ে ভাববার আগে আমাদের সবায়কে নিজেদের নিয়ে ভাবা উচিত।
আমি বললাম, তোদের প্যাচাল এখন থামা। পিসি ভাত দিচ্ছে। এখন আমরা খেতে বসবো।
খুব আরাম করে খেলাম। রোকন বলল, পান খাবে। ময়নাকে দিয়ে দোকান থেকে মিষ্টি জর্দ্দা দিয়ে পান আনালাম।  মাংস ভাত খাওয়ার পর পান চিবানোতে আলাদা মজা আছে। 
সুমি উৎপলদাকে দুপুরে এসে কি বলে গেল সে কথা এখনো তার পেট থেকে বের হয়নি। আমরা তার কাছ থেকে শুনতে চেয়েছি কিন্তু সে কিছু বলছে  না। শুধু বছলে সুমি এসে নাকি কেঁদেছে?
কেন কেঁদেছে?
জানি না।
তুই না জানলে কি আমরা জানি? সুমির সাথে প্রেম আমরা করেছি না তুই করেছিস? অনেক ঝগড়া, তর্ক তবু সে বলবে না। দুপুরে ভাত খাওয়ার পর বন্ধুরা কথা বলতে বলতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা টেরই পাইনি। ঘুম থেকে উঠে নামাজের ধ্বনি। আমাদের বাড়ির একটু দূরেই মসজিদ।
আমি উঠে ওদের ঘুম থেকে উঠালাম। বললাম উঠ বিকাল হয়ে গেঠে। একটু হাঁটতে বের হই। চল সবায় মিলে সুমিদের বাড়িতে যাবো।
সবায় হাত মুখ ধোয়ার পর ময়না আমাদের চা নাস্তা দিলো। চা শেষ করে মাকে বলে ঘুরতে বেরুবো বলে সুমিদের বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। ওদের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। রাস্তার মাঝ পথে এসে উৎপলদা বলে, তোরা যা আমি যাবো না। বললাম, কেন যাবি না?
আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
সবাই দাঁড়ালাম। রাস্তার পাশে বড় একটা পুকুর। আমি বললাম, চল সুমিদের বাড়িতে না গিয়ে আমরা সকলে এখানে বসি। কেউ প্রতিবাদ না করে সবাই গোল করে বসে পড়লাম।
উৎপলদাই আগে শুরু করলো। সে যা বললো তা এরকম, আমি সুমিকে একটা চড় মেরেছি। কারণ সে বলছে যে আমার সাথেই সে বিয়ে হবে। ওর বাবা-মার পছন্দ করা ছেলের সাথে বিয়ে হবে না। কিন্তু ওর বাবা-মা বলেছে যে আমার সাথে বিয়ে হলে তা তারা মেনে নিবেন না। এমনকি সুমির মার মরা মুখ নাকি দেখতে হবে যদি সুমি তার সাথে বিয়ে হয়। তবু সুমি আজ এসে বলছে, উৎপলদাকে বিয়ে করতে।
ওর কথা শুনে আমরা কেন যেন নীবর হয়ে গেলাাম। এই নীববের মধ্যেই আমরা নিজেরা নিজেদের সাথে কথা বলতে থাকি।
কিশোর বললো, চল আমরা বন্ধুরা সবায় মিলে সুমির বাবা-মাকে বুঝাই। দেখি কিছু করা যায় কিনা।
উৎপলদা বললো, তার আর দরকার নেই। যেটা না করেছি সেটা না-ই থাকবে। বললাম, তুই চুপ থাক। তুই এখন থার্ড পারসন। চুপ করে শুধু দেখ আমরা কি করি।
কি আর করবি। বড় জোর সুমিকে পাইয়ে দিবি। ওর সাথে আমার বিয়ে হবে। কিন্তু সেটাই তো শেষ সমস্যা নয়। কারণ ওকেও আমাদের পরিবারে কখনো মেনে  নিবে না।
কিশোর বললো, কেন ও তো দেখতে শুনতো খারাপ না। বরং এগ্রামের সেরা সুন্দরী। যতই সেরা থাকুক প্রেম করে বিয়ে আমাদের বাড়ির কেউ মেনে নিবে না- বললো উপলদা। তাহলে তো খুব শক্ত কাজ বললো, রোকন।
আমি বললাম, তুই আগে আরো ভেবে চিন্তে দেখ কি করবি। তুই যদি রাজি থাকিস তাহলে আমরা তোর জন্য সবার কাছেই যাবো। ছেলে-মেয়ে রাজি তো কিয় না করে গা কাজি?
শুনে সবায় হেসে দিল। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পৃথিবীতে অন্ধকার ঝাপিয়ে পড়েছে। এবার আমাদের ঘরে ফেরার পালা। বললাম, চল বাড়ির দিকে পা বাড়াই।
বিদায় নিয়ে সবায় যার যার বাড়ির দিকে চলে গেল। আমি চলে এলাম মায়ের আঁচলে। সারা দিন মাকে সময়ই দেয়া হয়নি।
মায়ের চেহারা খানি দিন দিন গন্ধারাজ ফুলের মত শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মায়ের øেহ মমতা আমার প্রতি বেড়েছে। মায়ের গা ঘেষে শুয়ে থাকি। মা আমার চুলে বিলি কেটি দেন। গরমের দিন তাই শরির থেকে শার্টটা খোলে ফেলি। মা আমার পিঠেও হাত বুলিয়ে দেন। আমি খুব সুখ অনুভব করি। ভাবি মা না থাকলে কে আমাকে এভাবে আদর করবে?
মা বলেন, কিরে পাতার সাথে দেখা করেছিস। বললাম, না । কেন মা?
না! এমনি জিজ্ঞেস করলাম। মেয়েটা না খুব লক্ষ্মী। 
তাই নাকি। মুখ টিপে হাসলাম।
জানিস ও একাদিন আমাকে দেখতে এসেছিল। আমার অনেক সেবা যতœ করে গেছে। বললাম, কই বলনি তো? 
এই যে বললাম।
বাবা রাত আটটার দিকে বাড়িতে আসলেন। তাঁকে দেখে আমরা তো অবাক। বাবা আপনি এখন আসলেন যে?
আসতে ইচ্ছে করলো তাই দু’দিনের ছুটি নিয়ে এলাম। 
বললাম, খুব ভাল হয়েছে। আমরা  রাত এগারটা পর্যন্ত টিভি দেখলাম। গল্প করলাম। তারপর রাতের আহার সেরে শুতে চলে যাই।
বাবা-মা পাশের ঘরে শুয়ে শুয়ে গল্প করেন। দু’একটা কথার আওয়াজ কানে ভেসে আসে। আমার ঘুম আসে না। গতরাতে শুতে না শুতে ঘুমিয়ে পড়ি। আজ কি হলো জানি না। বিছানায়  শুধু গড়াগড়ি করি।
একসময় পাশের ঘর থেকে চুমো দেওয়ার আওয়াজ আমার কানে ভেসে আসে। স্থীর হয়ে থাকি। আমার কান মাথা গরম হয়ে যায়। স্পষ্ট শুনি বাবা-মার চুমো দেওয়ার শব্দ। আমি এ পাশ থেকে ও পাশ ঘুরি না। যেন মা-বাবা  টের পেয়ে যাবেন যে আমি এখনো ঘুমাইনি । 
বাবা গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন প্রায় পনের বছর। তখন আমার বয়স দশ এগার। দেখতাম মাকে বাবা খুবই ভালবাসতেন। এখনও ভালবাসেন। পাশের ঘরে তাদের প্রেমে ঘরময় ভরে উঠেছে। সেই প্রেমের ছিটে ফুটা আমাকে ধোয়ে দিচ্ছে।
আমার বাবাকে কখনো মার সাথে উঁচু সুরে কথা বলতে দেখিনি। মা অভাবের সংসারে এটা সেটার জন্য পিড়াপিড়ি করলে বাবা কখনই রাগ করেননি। মাকে শান্ত করেছেন যেভাবেই হোক।
প্রায় শুক্রবার দিন বাবা মাকে নিয়ে বিকালে বেরিয়ে পড়তেন কখনো আত্মীয়র বাড়িতে দেখা সাক্ষাত করতে, কখনো বা কেনাকাটা করতে। তারপর প্রায় সময়ই তারা বাইরে খেয়ে আসতেন। তবে আমার জন্য সব সময় এটা সেটা আনতেন। মা-বাবার উপর সাময়িক সময়ের জন্য রাগ অভিমান করলেও বাবাকে কখনো অসম্মান করতে দেখিনি তাকে। বরং বাবার সব সিদ্ধান্তকে মা খুব শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিতেন।
আমি শুয়ে শুয়ে চিন্তা করি যে পাতা আমার সাথে বিয়ে হলে কি মার মত লক্ষ¥ী হবে? নাকি উঠতে বসতে রাগ করবে? আমার আবার যেসব মহিলা বেশি প্যান প্যান করে তাদের এক দম সহ্য হয় না। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আমার জীবনে যেন সে রকম মেয়ে মানুষ না আসে। পাতা অবশ্য সেরকম না। সে খুব সুন্দর করে কথা বলে। স্বল্পভাষী বলা চলে ওকে। স্বল্পভাষীরা কখনো বাচাল টাইপ মহিলা হয় না। হতে পারে না।

***

আজ শনি বার। বিকালে ঢাকা চলে যেতে হবে। রবিবার অফিসে যেতে হবে। পাতার সাথে দেখা হয়নি। ওর সাথে দেখা না করে গেলে মনটা খুব আনচান করে। হৃদয়টা ভিতরে ভিতরে কাঁদে। জানি না আমি কেন ওর প্রতি এত দুর্বল। ও কি আমার মত এত গভীর ভাবে ভালবাসে। এসব প্রশ্ন আমার মনে জেগে উঠে।
হাঁটতে হাঁটতে সকাল দশটার দিকে ওদের বাড়িতে উপস্থিত হই। গিয়ে দেখি দরজায় বড় তালাা ঝুলছে। তাদের উঠানে শুধু একটা কুকুর বসে আছে। আমাকে দেখে খেউ খেউ শুরু করে দেয়। এছাড়া আর কেউ নেই বাড়িটিতে। বুঝতে পারলাম ওরা নিশ্চয় কোথাও গেছে। হাটতে হাটতে চলে গেলাম রোকনদের বাড়িতে। ওর মা আমাকে খুব øেহ করেন। নিজের ছেলের মত ভালবাসেন। 
রোকনকে নিয়ে কিশোরদের বড়ি গেলাম। ওদের বাড়ি যেতে চারপাঁচ মিনিট লাগে। তিন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম সন্ধা ছ’টা সময় বাসস্ট্যান্ডে উপস্থিত থাকবো। কিশোর ওর মোবাইলে ঢাকায় ফেতর যাওয়ার খবরটা উৎপলদাকে জানিয়ে দেয়। 
মা আমাকে আশির্বাদ করেন। কপালে চুম্বন চিহ্ন্য একে দেন। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকা যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ি।
বাসস্ট্যাটন্ডে এসে দেখি সবায় এসেছে শুধু উৎপলদা আসেনি। ওর মোবাইল বন্ধ। কি হয়েছে কিছু বুঝা যাচ্ছে না। ঢাকাগামী এনপি এলিগেন্স এসে পড়ে। আমরা সবায় উঠে পড়ি। রাত দশটার মধ্যে ঢাকায় গিয়ে পৌঁছি। পরদিন অফিসে গিয়ে শুনি সকালে আমার ফোন এসেছিল। পাতা নামের কেউ। আমি অবাক হয়ে যাই। কারণ পাতা তো কখনো আমাকে ফোন করে না। এছাড়া গ্রাম থেকে এই ঢাকা শহরের ফোন করলে যথেষ্ট ব্যয় সাপেক্ষ ব্যপার। তবুও মন বার বার বলছিল যে পাতাই ফোন করেছে। কাজে তাই একটুও মন দিতে পারছিলাম না। পাতাদের মামার বাড়ি ধানমন্ডিতে। সে ঢাকায় আসলে সেখানেই বেড়ায়। তার মামার বাসার ফোন নাম্বার সে আমাকে দিয়েছিল। বাসায় নোট খাতায় আছে। বিকেলে অফিস থেকে ফিরে সেখানে ফোন করবো। কেন জানি খুব অস্থির লাগছে। পাতা আমাকে কেন ফোন করেছিল? কোন কি খুশির খবর? যেবার সে এসএসিতে ই+ পায় খুশিতে সে আমাকে গ্রাম থেকে ফোন করেছিল। এই বারও কি এমন কোন খুশির খবর। তার এইচএসসি’র রেজাল্ট তো এখনও হয়নি।
বাসায় ফিরি অন্য দিনের চেয়ে একটু আগে। আজ কোথায়ও দেরি করিনি। কলেজেও যাইনি। তনুদি হাসি মুখে দরজা খোলে দেয়। তার চাঁদ মুখ দেখে হৃদয়টা ভরে যায়। তিনি বলেন, কি আজ যে এত আগে ফিরলে?
এমনি।
কলেজে যাওনি?
না । দিদি আজ একজন অফিসে ফোন করেছিল।
কে?
পাতা।
তাই নাকি?
হু।
কি ঢাকায় এসেছে?
মনে হয় এসেছে। আর এসে থাকলে সে ওর মামার বাসায় আছে। বিকেলে ফোন করবো।
বাসায় আসতে বলো।
ঠিক আছে বলবো।
ঠিক আছে বলবো।
মাহি ঘুম থেকে উঠে গেছে। সেকি জোরে কান্না। আমি দৌঁড়ে গেলাম মাহির কাছে। ওর মা তনুদি বাচ্চাকে কোলে নিলো নিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে শান্ত হল।
 আমার ঘরে এসে কাপড় পাল্টালাম। হাত মুখ ধোয়ে খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। বালিশের এক সাইডে সমরেশ বসুর ‘ফিরে দেখা’ উপন্যাসটি রাখা। ডান হাতদিয়ে সেটি তুলে নিলাম চোখের সামনে। কিন্তু মনোযোগ দিতে পারলাম না। বই পড়ার সময় কেন যেন বার বার পাতার কথা মনে পড়ে। আমার দুপুরে ঘুমনোর ঔষধ বই পড়া। বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ি। আজকে ঘুমও আসছে না। আধা ঘন্টা পরে তনুদি আমার ঘরে এসে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলো, ঘুমাচ্ছ?
না। ঘুম আসছে না।
কি পাতার চিন্তায়?
জানি না।
শোন বিকালে মার্কেটে যাবো। আমার সাথে যেতে হবে। কি রাজি
রাজি।
তাহলে আমি ঘরের কাজগুলো শেষ করে ফেলি। তুমি তৈরি হয়ে থেকো। 
ঠিক আছে।
বিকাল চারটির দিকে আমি আর তনুদি ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে বের হলাম। নিউ মার্কেটে থেকে তনুদি তার সংসারের জন্য অনেক টুকিটাকি জিনিস কিনলো। প্রায় সব কিছু কেনা কাটা শেষে। এখন ফেরার পালা। বাসায় মাহিকে বাসন্তির কাছে রেখে আসা হয়েছে। বাসন্তিকে তনুদির মা কাজ কর্মে সাহায্য করার জন্য পাঠিয়েছেন। তনুদি বললো, ক্ষুধা লেগেছে।
কি খাবে? চটপটি, ফুচকা না তেহারি।
ফুচকা।
ফুচকার দোকানে  গেলাম। ফুচকার অর্ডার দিলাম। ফচিকা খেয়ে বাসায় চলে এলাম। 
পাতার মামার বাসার টেলিফোন নাম্বার নিলাম। টেলিফোনের দোকানে গিয়ে ফোন করতে পাতার মামী ফোন রিসিভ করলেন। বললেন কাকে চান?
পাতাকে চাই।
ও পাশ থেকে শোনা গেল - এই পাতা তোমার ফোন।
চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ পাওয়া গেল। পাতা কেন যেন সব সময় চুড়ি পরে থাকে। সে মনে হয় চুড়ি পড়তে খুব ভালবাসে। ও পাশ থেকে পাতা বললো, হ্যালো কে?
বললাম, আমি। চিনতে পারলো সে।
সে বললো, কেমন আছ?
 ভাল। তুমি কেমন আছ?
মোটামুটি। আমার মনে হচ্ছিল তুমি আমাকে ফোন করবে।
ঢাকা কবে আসলে?
গতকাল।
আমরাও তো  আসলাম। সাথে রোকন কিশোর ও রূপক এসেছে। উৎপলদা মনে হয় আজ এসেছে। কেন ফোন করেছিলে?
এমনি।
তোমাকে যে ফোন করলাম তাতে তোমার মাসি তোমাকে জিজ্ঞাস করবে না আমার সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক।
আমার মা-বাবা এত রক্ষণশীল না। এছাড়া তিনি যথেষ্ট আধুনিকা। জান তিনি আমাকে আজ বিউটি পার্লারে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তাই নাকি? তাহলে তো তুমি আরো সুন্দর হয়ে  গেছ।
সুন্দর না ছাই।
গত কাল তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি বড় তলা ঝুলছে। বাড়ির উঠানে সিউরিটি গার্ড তোমাদের কুকুর বসে আছে।
পাতা হেসে দিলো।
তোমার মা কেমন আছেন?
ভাল। কি কথা বলবে?
না এখন না আগে তোমার সাথে কথা বলি তারপর শ্বশুড়ির সাথে কথা বলবো।
কি বললে? এরকম কথা বলতে তোমার একটুও লজ্জ্বা করে না?
লজ্জ¦া কিসের?
তার মানে তুমি নিলর্জ্জ্ব।
না তা ঠিক না। কেন আজ না হোক কাল তো তোমার মা শাশুড়ি হবেনই।
কচু হবেন!
কচু হলে তো ভালই। তরকারি রান্না করে খাওয়া যাবে।
তুমি ইয়ার্কি করছ।
হু। ইয়ার্কি বাদ দাও। শোন তোমার বাবা-মার খবর কি? তারা ভাল আছেন তো?
মার শরিরের উন্নতির লক্ষণ দেখছি না। আর  বাবা তো ভালই আছেন। তুমি ঢাকায় কয়দিন আছ?
এই ধর তিনচারদিন।
এত কম?
বাড়ি যে খালি!
হেসে বললাম, কুকুর তো আছে।
সেটা তো আছেই।
একদিন পুরান ঢাকায় আমার কাছে আসবে না? দেখবে না বন্ধুটা কিভাবে বেঁচে আছে?
আসবো।
কবে?
জানি না।
এটা আবার কেমন কথা?
 আমি কি চাইলেই সব জায়গায় যেতে পারি? তোমরা ছেলে মানুষ যেখানে খুশি যেখানে যেতে পার। আমরা পারি না। 
তা ঠিক। তবে এক বিকেলে আসলে খুব খুশি হতাম।
সে নীবর।
শোন তোমার বান্ধবী সুমির কি খবর? সে নাকি বিয়ে যয়ে যাচ্ছে।
হু এ মাসের পনের তারিখে ওর এঙ্গেজমেন্ট। 
কাজটা কি ভাল হচ্ছে?
সে নীবর।
পাতা আমি জানি মেয়েদের ছেলেদের তুলনায় আগে বিয়ে হয় কিন্তু সুমি আর কিছু দিন অন্তত অপেক্ষা করতে পারতো।
ওর কথা আমাকে বলে কি লাভ? তুমি ওকে বল না! আমি ওকে অনেক বলেছি যে উৎপলের মত ছেলেই হয় না।
উৎপলদার সার্পোট দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ওর পক্ষে কাজ করলে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
উৎপলের পক্ষে না হয় আমি কাজ করলাম কিন্তু তোমার পক্ষে কে কাজ করবে?
কেন তুমি রাজি থাকলে কিসের অসুবিধা।
এতটা নিশ্চিত হয়ে কিভাবে বলছ যে আমি তোমার সাথে রাজি আছি?
কেন তোমার চোখ দেখেই তো বুঝা যায়।
ছাই বুঝা যায়। বাসায় মানুষ। টেলিফোনে কি এই সব কথা বলা যায়? আজ রাখি পরে কথা হবে। সে আমাকে সুয়োগ না দিয়ে টেলিফোন রেখে দেয়। দোকান থেকে টেলিফোন করে বাসায় আসতেই তনুদি বললো, কি কথা হলো?
 বললাম, হয়েছে। আসতে বলেছি। মনে হয় আসতে পারবে না।
কয়দিন ঢাকায় থাকবে ওরা?
তিন চার দিন।
তবু একদিন বাসায় আসতে পারে।
সেটা তো চাইলেই পারে না। কে ওকে এত জানজট ঠেলে নিয়ে আসবে।
কেন তুমি গিয়ে নিয়ে আসবে!
হ্যাঁ। আমি ওর মামার বাসায় গেলে আমাকে ঝাটা পেটাই না বুঝি করে!
কেন ঝাটা পেটা করবে কেন? তুমি না বলেছিলে পাতাদের পরিবারে তোমার যথেষ্ট সুনাম আছে। তারা তোমাকে পছন্দ করে। তারা জানে তুমি পাতাকে বাল্যবন্ধু। 
তা জনে। কিন্তু তবু আমার ভয় হয় যদি কিছু বলে ফেলে?
কিচ্ছু বলবে না। তুমি কাল ওর সাথে দেখা কর। পারলে বাসায় নিয়ে আস। আমি ছোট ভাইরয়ে বউটাকে দেখেবো, বললো তনুদি ।
আমি বললাম, দেখা যাক। কাল সকাল হোক তারপর। আমি পরদিন অফিসে গিয়ে একটু আগে ছুটি নিই। বাসায় এসে হাতের কাজ করে দুপুরের খাওয়া  খেয়ে বের হই নতুন ঢাকার ধানমণ্ডির উদ্দেশ্যে। পাতার মামার বাসায় যাই। গিয়ে শুনি পাতারা বাসায় নেই। নন্দন পার্কে গেছে। অফিস ছুটি নিয়ে পুরান ঢাকার জানজট ঠেলে এত দূর এলাম পাতার কাছে আর এখন শুনি পাতা নেই। নিজেকে বড় বোকা মনে হচ্ছে। মন খারাপ করে পাঁচতলা থেকে নামলাম।  
বাব বসে আছেন বিছানায়। খবরের কাগজ পড়ছিলেন। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, এত দেরি করলে কেন?  বাড়ি যেতে হবে। তোমার মার অবস্থা খারাপ। বাবা বললেন আমি অফিসে বসে খবর পেয়েছি। এক সপ্তাহ ছুটি নিয়েছি। আমি মাত্র ভাত খেয়ে পত্রিকা পড়ছিলাম। তুমি খেয়ে নিও। আমি গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি। বললাম, টিকেট কাটা আছে?
হু মর্ডান  গাড়িতে কেটেছি। বাবার ব্যাগ রেডি ছিল। তিনি ঘর থেকে পা বাড়ালেন বাড়ির উদ্দেশে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে মনে বললাম যে করেই হোক আজ সারাটি দিন সুন্দর কার কাটাবো। মন খারাপ হওয়াকে পাত্তা দিবো না। সকালে বাসায় খাবো। দুপুরে খাবো হোটেলে। বিরানী। সকালের জন্য আধা পট চাউল আধা কাপ মুসুর ডাল দুটি পিয়াজ ও চারটি মরিচ দিয়ে তেলে ভাজলাম। তারপর খিচুরি রান্না করলাম। মার দেওয়া জলপায়ের আচার দিয়ে গরম গরম খিচুরি খেলাম।
অফিসে খুব মন দিয়ে কাজ শরু করেছি। আমদানি রপ্তানির একটা অফিসে আমি ডিউটি করি। অফিসের মারামাল আনা নেওয়ার হিসাব রাখতে হয়। আধা ঘন্টা পর আমার ছুটি। এমন সময় আমার দুুটি টেলিফোন আসলো। দুইটাই খারাপ সংবাদ। তাই আর জোর করেও আমার দুর্বল মনটাকে শান্ত রাখতে পারলাম না। প্রথম ফোনটা করেছেন গ্রামের মোবাইল ফোনের দোকান থেকে বাবা। তিনি বলেছেন, মার অবস্থা খুবই খারাপ। ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় সংবাদটি শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। পাতা বলছে তার বিয়ের কথা বার্তা চলছে। গতকাল পাত্রপক্ষ তার মামার বাসায় রাতে তাকে দেখে গেছে। বলেছে তাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি সব পাকাপাকি হবে।
আমি পাতাকে শুধু বলেছি এখন কিছু বলো না, আমার মাথা এমনিতে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মা মরণাপন্ন। আমার মার জন্য প্রার্থনা কর যেন তিনি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠেন। পাতার ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারিনি। যেন পাতার বিয়ে হয়ে গেলে আমার কিছু যায় আসে না। 
অফিস থেকে বের হয়ে বার বার পাতার কথা মনে হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার। মাঝখানে একদিন ছুটি আছে তাই বাড়িতে যাবো। যাওয়ার আগে পাতাকে একবার ফোন করলে কেমন হয়? ভাবতে ভাবতেই ফোনের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলাম। ফোন ধরলো পাতা।
হ্যালো বলতেই পাতা  আমাকে চিনে ফেললো। বললাম, শোন গতকাল তোমার মামার বাসায় গিয়েছিলাম। তোমরা নন্দনে গিয়েছিলে। তাই ফিরে এসেছি। কখন সেখান থেকে ফিরেছিলে?
সন্ধ্যা ছটার দিকে।
কয়টার দিকে দেখতে এলো?
সন্ধ্যা সাতটার দিকে।
তোমার পাত্র পছন্দ হয়েছে?
কি বললে?
বললাম তুমি কি রাজি। সে নীবর। আমি জানি সে আমাকে পরীক্ষা করার জন্য বলবে হ্যাঁ খুব পছন্দ হয়েছে।
জিজ্ঞাস করলাম, কি চুপ করে আছ কেন।
সে রেগে বললো, আমার মাথা মুণ্ডু কিচ্ছু তুমি বুঝ না। ফুপিয়ে কেঁদে সে বললো, হ্যাঁ,  ছেলে আমার পছন্দ হয়েছে।
আমি বোকা বনে গেলাম।
বললাম, সরি।
আমরা আবার দু’জনে কিছুক্ষণ নীরব।
বললাম, গ্রামে যাচ্ছি। মাকে দেখতে।
আজ রাতে আমরাও যাচ্ছি। 
তাই নাকি?
হু।
কোন গাড়িতে?
মর্ডানে। তুমি?
এলিগেন্স। কাল বাড়িতে এসো। কি হয়েছে সব শোনবো।
ঠিক আছে। আমি যেতে না পারলে বিকালে তুমি আমাদের বাড়িতে এসো।
কথা শেষে বিদায় নিয়ে বাসায় গেলাম। তনুদিকে বললাম মার কথা। তাকে বাসায় বন্ধু বান্ধব কেউ এলে যেন বলে আমার মার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। তাই মাকে দেখতে গেছি।
নাটোর পৌঁছে টেলিফোনের দোকানে এসে মোবাইলে উৎপলদাকে মার কথা বললাম। বললো, ও বিকালে রওনা দিবে। বাড়িতে গিয়ে দেখি সব আÍিয় স্বজনরা এসেছে। মাকে ঘিরে সবাই বসে আছে। মা কথা বলতে পারছেন না। আমাকে দেখে মা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মার মুখ পড়েই আমি বুঝতে পারি তার বেঁচে থাকতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তিনি এখন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। বাবা খুবই ভেঙ্গে পড়েছেন। কাকারা জেঠারা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। 
মা সেদিনই রাত্রে মারা গেলেন। মসজিদ থেকে তখন আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। আমি জেগে জেগে ভোর হওয়া দেখছি। পাশের ঘরে পিসি ও বাবা জোরে কান্না কাটি করছে। ময়না আমাকে ডাকতে আসে। তুহিনদা  ও তুহিনদা। দেইখ্যা যান মায় মইরা গেছে গা। ময়না এই কথাটা এত সহজ ভাবে বলতে পারলো? ইচ্ছে করছে ওর গলা টিপে ওর কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেই। যেন আর কোন দিনে এরকম ভঙ্কর কথা বলতে না পারে।
 বিছানা থেকে আমার উঠে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। এখন পাতার কথা মনে হচ্ছে। মার সাধ ছিল পাতাকে তার ছেলের বউ করার। মা, মাগো তুমি সত্যি চলে গেলে আমাকে একা ফেলে?
পাশের ঘরে স্বজনদের কান্নার রোল পড়ে গেছে। আমাকে ডাকার জন্য দরজার ও পাশে ময়নার সাথে আরো দু একজন যোগ হয়েছে। জোরে জোরে ডাকাডাকি করছে। আর শুয়ে থাকা যায় না। আমি মার প্রাণহীন দেহের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমাকে দেখে বাবাব যেন আরো হাউমাউ করে কাঁদছেন। কি আশ্চর্য! আমার চোখে এক বিন্দুও পানি নেই। আমি কাঁদতে পারছি না। যেন আমি কাউকে চিনতে পারছি না। পাশের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়লাম।
আস্তে আস্তে আলো হচ্ছে। মার মাথার কাছে গিয়ে বসি। মার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর দেই। এবার আমার চোখ বেয়ে পানি বের হতে থাকে। মা আমাকে কত মাথায় আদর করতেন। এখন সেই মা আর নেই। মার মুখের দিকে যতই তাকাই ততই চোখের অশ্র“ ধারা জোরে প্রবাহিত হতে থাকে।  পিসিরা এসে আমাকে সান্ত্বনা  দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেক বেলা হয়ে গেছে। আমাকে নাস্তা খাওানোর জন্য রান্না ঘরে নিয়ে যাওয়া হল।
এক গ্লাস পানি ছাড়া আর কিছুই খেতে পারলাম না। দুপুরে এক সাথে আমার সব বন্ধুরা হাজির। ওরা ঢাকা থেকে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে এসেছে। ওদের জন্য পিসিরা খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমরা পাঁচ বন্ধু মিলে দুপুরে এক সাথে খেলাম।
বিকালে পাতা ও সুমি আসলো মাকে দেখতে। আমরা বন্ধুরা উঠানের লিচু  গাছতলা বেঞ্চের মধ্যে বসা। ওরা দু’জন আমাদের সামনে এসে দঁড়ালো। আমি কিছু বলার ভাষা খুজে পেলাম না। কিশোর ওদের বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল। ওরা এক ঘন্ট মার কাছে ছিল। আমরা তখনো গাছের ছায়ায় বসে আছি। ওরা যাওার সময় আবার আমাদের কাছে আসলো। পাতা জিজ্ঞেস করলো কখন মাকে মাটি দেওয়া হবে। রোকন বললো, কাল সকালে। সুমি বললো, আমরা তখন আসবো। কবরস্থানে যাবো।
পাতা আমার দিকে ঘন ঘন তাকাচ্ছিল। আমি ওকে কিছু বলতে পারি না। সে হয়ত আমাকে সান্ত্বনা দিতে চাইছে কিন্তু তার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারি সে কি বলতে চায়। শুধু ওরা যাওয়ার আগে বললাম, কাল এসো কিন্তু।
আমার বন্ধুরা মার মর দেহের কফিন নিয়ে কবরস্থানে গেলাম। সাথে আরো অনেক মানুষ। আমাদের গ্রামের মানুষ, আÍিয় স্বজন, পাতা, সুমি।
মাকে কবরে শুয়ে দিয়ে সবাই চলে গেল। আমরা বাবাকে দুই তিনজন ধরে  নিয়ে বাড়িতে গেল। তার যে পথের সাথী আর নেই। তিনি বড় একা হয়ে গেলন।
পাতা ও সুমি কবরস্তানে আসার সময় কয়েকটা পাতা বাহার গাছ নিয়ে আসে। মার কবরের সামনে সেগুলো ওরা লাগিয়ে দেয়। আমরা পাঁচ বন্ধু মাকে কবরে শুয়ে দিয়ে মাটিতে একাকার হয়ে গেছি। মায়ের কবর সুন্দর করে লেপে একটা কাঠের ক্রুশ গেঁছে দেই কবরের পূর্ব দিকে।
মাকে কবর দিয়ে আমরা সবাই ক্লান্ত। আমরা পাঁচজন, সুমি ও পাতা ছাড়া সবাই বাড়ি ফিরে গেছে। আমাদেরকে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলে গেছেন কাকা ও পিসিরা। কিন্তু আমরা কবরস্থানের একটা গাছের তলায় বসলাম। আমরা মনের হচ্ছে না যে এই মাত্র মাকে সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে রাখলাম।
রোকন বললো, এখন খুব ভাল লাগছে। আমরা সাত বন্ধু এক সাথে হয়েছি। চল আজকে অনেক্ষণ গল্প করবো। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। বাড়ি থেকে পিসির মেজ মেয়ে রুমি আমাদের ডাকতে এসেছে। রুমিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। বললাম, যা আসছি।
সাতজন উঠে দাঁড়ালাম। পাশাপাশি হাঁটছি সবাই। গ্রাম থেকে কবরস্থানটি পনের মিনিটের পায়ে হাঁটার রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতে একসময় কিশোর বললো, কি দুই সুন্দরী সুমি আর পাতা তোমরা কি তোমাদের পথের সাথীদের সাথে সারা জীবন হাঁটতে পারবে না? সুমি বললো, কেন? শুধু সারা জীবন কেন অনন্ত কাল পারবো। পাতাও যেন বান্ধবীর কথায় স্মিত হেসে সাই দিলো। আমরা বন্ধুরা সবাই মুখ টিপে হাসলাম।
উৎপলদা একটা সিগারেট ধরালো। বাড়ি পৌঁছাতে আরো দশ মিনিটের পথ। ওর কাছে গিয়ে বললাম, যা সুমির সাথে কথা বল। সে সুমির পাশাপাশি হলো। আমি পাতার পাশাপাশি। বাকি তিন বন্ধু আমাদের আগে আগে হাঁটতে লাগলো।
আমার সারা গায়ে মাটি। মাকে করব দেওয়া মাটির গন্ধ আমার গায়ে। আমরা দুটি প্রাণী নীবর। পাতা হঠাৎ আমার  হাতটি ধরলো। তার মুঠোয় নিলো। আমাদের একটু পিছনে উৎপলদা আর সুমি। পিছনে তাকাতেই দেখি ওরাও হাতে হাত ধরে হাঁটছে। আমার সামনে তিন বন্ধু যেন হাঁটার প্রতিযোগিতায় লেগেছে। ওরা খুব দ্রুত পা চালাচ্ছে। আমি আমার পথের সাথীর হাত শক্ত করে চেপে ধরলাম যেন কোন দিন ছুটতে না পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন