বৃহস্পতিবার, ৫ মে, ২০১৬

সংসার

গল্প
পরিবেশ থমথমে।
Sumon Corraya's short story, সুমন কোড়াইয়ার ছোট গল্পকারো মুখে কথা নাই। নীরবতা। দুই মিনিট পর ফাদার আকাশ পালমা চশমা খোলে বললেন, তোমরা এখানে এসেছ সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু কেউ কারো কথা শুনছ না। শুধু একে অন্যের দোষারোপ করছ। বিষয়টা খুব দুঃখজনক। খ্রিস্টান পুরোহিতদের ফাদার বলা হয়।
শ্যামল রোজারিও বললো, ফাদার, নিপা আমার কাছে অনেক কিছু লুকায়।


নিপা সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর কথা প্রসঙ্গে বলে, ফাদার, শ্যামলও আমার সঙ্গে সহভাগিতা না করে সংসারের অনেক সিদ্ধান্ত একা নেয়। আমাকে না জানিয়ে অন্য মানুষের কাছ থেকে সুদে টাকা নেয়...।
ফাদার আকাশ পালমা তাদের আবার থামালেন, তোমরা থাম! একজন একজন করে কথা বল। হ্যাঁ, নিপা তুমি বল।
নিপা কিছুক্ষণ চুপ। সে কি বলবে। সংসারের সমস্যা নিয়ে ফাদারের কাছে আগেও কয়েকবার এসেছিলো। সমস্যা তো আবার হয়েছে। সমস্যা বার বারই হয়। সে আসতে চায় না। স্বামীর জোরাজুড়িতে প্রতিবার ফাদারের স্মরণাপন্ন হতে হয়। দেখা যাক এবার ফাদার কি পরামর্শ দেন।
নিপা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললো, সে তো আমার কোন কথারই গুরুত্ব দিতে চায় না। আমাকে অবহেলা করে। সময় দেয় না। আবার সন্দেহ করে! আমি নাকি কার সাথে..। থেমে যায় নিপা। তার কণ্ঠ রোধ হয়ে উঠে। ফুপিয়ে কাঁদাতে থাকে সে। আমি এভাবে আর সংসার করতে পারবো না ফাদার! কথাগুলো থেকে অভিমান, কষ্ট ঝরে পড়ে ২৩ বছর বয়সী  নিপার।
তাদের দাম্পত্য জীবনের বয়স আড়াই বছর হচ্ছে। গ্রামের মেয়ে নিপা বিয়ের পর স্বামীর সাথে ঢাকায় থাকে। সংসারের পাশাপাশি অনার্সে পড়াশুনা করছে সে।  তার স্বামী একটি এনজিওতে চাকরী করে। দুটি রুমের ছোট একটি ফ্লাটে থাকে তারা। শ্যামলের রোজগার ভাল। সংসারে কোন অভাব নেই। শুধু অভাব একটি জিনিসের। সুখের।
শ্যামল স্ত্রী নিপার কান্না থামার পর একটু গলা শব্দ করে কাশল।
ফাদার আকাশ পালমা বললেন, শ্যামল বাবু, এবার তোমার কি কথা আছে সেটা বল? তোমার স্ত্রী যা বলেছে সেটার উত্তর দাও?
শ্যামল স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললো, আমার দিকে তাকাও  সোনা!
নিপা স্বামীর দিকে তাকাল। শ্যামল গোপনে আদর করে তাকে সোনা বলে ডাকে। সেই নামে সে ফাদারের সামনে ডেকে ফেলেছে? লজ্জ্বা পেয়ে গেল।
শ্যামল বললো, হ্যাঁ, আমি চাকরীর কারণে সারা দিন নিপাকে সময় দিতে পারি না ফাদার। এই কথা সত্য। তবে সপ্তাহে একদিন ছুটির দিনে অন্তত তাকে সারা দিন সময় দেই। তখন তাকে নিয়ে কেনাকাটা করি। কখনোবা কোথাও বেড়াতে যাই। নয়ত ঘরেই থাকি।
আর হ্যাঁ, সুদে টাকা নেওয়ার বিষয়টাও সত্য। আমি বিপদে পড়ে এক পরিচিতজনের কাছ থেকে কিছু দিনের জন্য সুদে টাকা নিয়ে ছিলাম। বিষয়টা আমি নিপাকে পরে বলি। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের সংসারের আসল সমস্যা এগুলো না। সমস্যা অন্য জায়গায়।
ফাদার বলিষ্ঠ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে সমস্যা কোথায়? একক সিদ্ধান্ত? সন্দেহ?
নিপা চোখ মুছতে মুছতে বললো, হ্যাঁ ফাদার!
শ্যামল অপরাধীর কন্ঠে বললো, একক সিদ্ধান্ত নিই এটাও সত্য। তবে সব সময় না। আমি যখন যেটা ভাল মনে করি, সেটাই করি। আর সেটা সংসারের মঙ্গলের জন্যই করি। অফিসের কাজে মাঝে মধ্যে আমাকে টোরে যেতে হয়। ব্যস্ত থাকি। তখন হয়ত নিপার সাথে যোগাযোগ কম হয়। ভুল বেশির ভাগ তখনই হয়। কোন একটা কাজ করে পরে নিপাকে বলি, আর নিপা এতে রাগ করে। তবে ভেবে দেখেছি কাজটা যদি তাকে জানিয়ে করতাম, তবে সে প্রথমে রাজি না হলেও পরে তাকে রাজি করনো যেতো। তবে নিপা সন্দেহ করার মত কাজ করে। শেষের কথাটা বলার সময় শ্যামলের কন্ঠে কিছুটা হতাশার সুর পাওয়া যায়।
নিপা ফাদারের দিকে চেয়ে বলে, দেখেন তো ফাদার, শ্যামল আমাকে শুধু শুধু সন্দেহ করে। পড়াশোনা করলে দু’একজন ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হতে পারে। তাদের সাথে কথা বললেই শ্যামল আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। কিছু বললে, মুখ কালো করে থাকে।
সব দোষ যেন শ্যামলের। তার দিকে তাকায় কাথলিক খ্রীষ্টানদের একটি ধর্মপল্লীর আধ্যাত্মিক গুরু ফাদার আকাশ পালমা। তাকায় নিপাও।
এবার নড়ে চড়ে বসে শ্যামল।
ফাদারের চাহনি তাকে নীরবে জিজ্ঞেস করছে, জবাব দাও হে পুরুষ নামে কলঙ্ক! অসহায় নারীকে কেন নির্যাতন করছ?
শ্যামল ইতস্ত করে বলে, কি বলবো ফাদার! কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি তো আমিও পেড়িয়েছি। কত বন্ধু-বান্ধব আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে এখন আমার বন্ধুর সংখ্যা ৭৭৫ জন। সবার গল্পই করি নিপার সাথে। কিন্তু নিপা তার কোন বন্ধুর কথা আমার সাথে সহভাগিতা করে না। দেখা গেল আমি অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে নিপার সাথে চা নাস্তা খাচ্ছি। একটা ফোন আসলো। আর নিপা ফোন নিয়ে হ্যালো হ্যালো করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে আড়ালো গিয়ে কথা বললো। সে কার সাথে কথা বলছে, কে জানে? আমাকে বলে না। আমি তো তার সামনে ফোনে কথা বলা নিয়ে লুকোচুড়ি করি না। বরং বলি ওমুকে ফোন দিয়েছিলো।
নিপা বললো, দেখেছেন ফাদার। বিয়ে হয়েছি দেখে আমার বন্ধু-বান্ধব থাকবে না! আমি ওকে বলি আমার কলেজের  ফ্রেন্ডরা আমাকে ফোন দেয়। তবু সে আমার কথা বিশ্বাস করতে চায় না।
সব কথা শুনে ফাদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মৃদু হেসে বললেন, তোমাদের সমস্যা তোমরা নিজেরাই। সমাধান তোমাদের মধ্যেই আছে। শ্যামল দীর চিত্তেই নিজের দুর্বলতার কথা স্বিকার করেছে নিপা। কিন্তু তুমি সেটা করছ না। আমি বুঝতে পারছি, তোমাদের বড় সমস্যাটা আসলে ফোনে কথা বলা নিয়ে।
 নিপা বললো, হ্যাঁ ফাদার ঠিক তাই।
শ্যামলও মাথা ঝাকিয়ে সাই জানালো।
 ফাদার বললো, নিপা চিন্তা করে দেখ তোমার মত যদি শ্যামলও মোবাইল নিয়ে আড়ালো গিয়ে কথা বলে তখন ব্যাপারটা তোমার কাছে কেমন লাগবে?
নিপা লজ্জ্বিত হয়ে বলে, খারাপ লাগবে ফাদার!
ফাদার আকাশ পালমা আনন্দে উজ্বাল হয়ে বললেন, এটা যখন বুঝেছ তার মানে তোমাদের সমস্যা ৯০ ভাগ সমাধান হয়ে গেছে। তোমরা এখন বাসায় যাও। সাধু যোসেফ ও মা মারিয়ার মত আাদর্শ পরিবার গঠন কর। শুধু একে অন্যের দোষ ধরো না। মানুষ হিসাবে সবাই কিছু না কিছু ভুল করে। আর একে অন্যকে সম্মান দিবে, বিশ্বাস করবে।
নিপা উঠে দাঁড়ায়। স্বামীর হাত ধরে। বলে, ঠিক আছে এরকম আর হবে না।
শ্যামল উত্তরে বললো, এখন থেকে আমিও তোমার সাথে সব কিছু সহভাগিতা করবো। তারা ফাদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফাদারের অফিস থেকে বের হয়ে আসে। দু’জন হাত ধরে বাসার দিকে রওনা দেয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন