প্রবন্ধ
তেজগাঁও গীর্জা। বিবাহ প্রস্তুতির ক্লাশ। জোড়ায় জোগড়া ছেলে-মেয়েরা বসে আছে। পরিচিতি পর্বে আমাদেরকে ফাদার মিন্টু এল. পালমা জিজ্ঞেস করলেন, প্রেম কয় দিনের?উত্তর : পাঁচ বছরের।
সবাই চোখ বড় বড় করে তাকায় আমাদের দিকে। যেন দীর্ঘ দিন প্রেম করাটা একটা অপরাধ! অথবা দীর্ঘ দিন প্রেম টিকে ছিলো এই জন্য সাব্বাস!
ফাদার পালমার পাল্টা প্রশ্ন : এত দিন প্রেম করলা তোমারে দেইখ্যা তো মনে হয় না!
সত্যি, আমাকে ছোট বেলা থেকেই সবাই ফাদার হওয়ার জন্য বলতো। দাদু তো ফাদার বলে যীশু প্রণাম পর্যন্ত দিতো। এসএসসির পরে সেমিনারীতেও যাই। থাকার চেষ্টাও করেছিলাম। প্রেমিক মন সেখানে স্থির থাকে না। আমার অবস্থাটা পানির মাছ ডাঙ্গায় গেলে যেরকম হয়- সেরকম আরকি।
ফিরে আসলাম সেমিনারী থেকে। কলেজে পড়ছি। সাথে চাকরী করি। একজনকে ভালো লাগে। প্রস্তাব দেওয়ার সাহস পাই না। যদি প্রত্যখান করে! বুকে সাহস নিয়ে এক হেমন্তের বিকেলে মনের কথাটি বলেই ফেললাম। সেও জানালো সে আমাকে পছন্দ করে। সে সম্মতি দিলো। ব্যাটে বলে ছক্কা!!
তার পর থেকেই শুরু। কত বিকেল গড়িয়ে গেছে সংসদ ভবনের সামনে বসে। কত গেছি জিয়া উদ্যানে, ধানমন্ডি লেকে! আরো কত জায়গায়!!আমরা ছাত্র থাকা সত্ত্বেও দু’জনের পরিবার থেকে আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেওয়া হলো। তাদের আকারে ঈঙ্গিতে বুঝা গেল, আগে পড়াশোনা শেষ করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক তার পর দেখা যাবে। আমাদের মায়েরা মাঝে মাঝেই স্মরণ করিয়ে দেন, সাবধান! এমন কিছু করো না যেন মান-সম্মানে আঘাত আসে। আঘাত আসেনি।
একদিন আমরা বিকেলে ঘুরতে গেছি সংসদ ভবন এলাকায়। সূচনার এক পিসির সাথে দেখা। নমস্কার দিলাম। সূচনা আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। পরে পিসি গ্রামের বাড়িতে সূচনাদের মা-বাবাকে বললেন যে আমরা ঘোরাঘুরি করি। আমার প্রেমিকার অভিভাবক পক্ষ তাকে সতর্ক করে দেওয়া হলো যেন বেশি ঘোরাঘুরি না করি। কিন্তু ঘোরঘুরি কি আর থামে!! ঢাকা শহর। আমরা মুক্ত পাখি। এখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের অভিভাবক। কারণ আমাদের বাবা-মারা থাকেন গ্রামে।
আরেক দিন হলো কি, আমার দুর সম্পর্কের এক দুলাভাই শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরির সামনে আমাদের দেখেন। দেখে অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন আমাদের না দেখার ভান করে। বিষয়টাতে আমরা দুজনই খুব মজা পেলাম। দুলাভাইকে গিয়ে বললাম, কেমন আছো?
পরিচয় করিয়ে দিলাম আমার ইয়ের সাথে। আমাদের চারপাশের মানুষ/সংস্কৃতি যেন মনে করিয়ে দেয় প্রেম করাটা অপরাধ? একদিন এক ফাদার প্রেম করি শুনে বললেন, কি, তুমি প্রেম করো!!! যেন বাংলাদেশের মানুষ এই গ্রহের কেউ না। প্রেম করাটা অন্যায়!! প্রেম করাটা বিদেশী সংস্কৃতি। অথচ উপদেশে তারা কতই না প্রেম প্রেম করে চিল্লাচিল্লি করে বেড়ান। আবার ভিন্ন কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাথে বিয়ে হলে বলে সসম্প্রদায়ের সাথে প্রেম করে বিয়ে করতে পারলো না!! থাক আর এই সব বিতর্কীত বিষয়ে যেতে চাই না।
আমার বাবা একবার আমাকে সাবধান করে দিলেন, সূচনাদের বাড়িতে বেশি না যেতে। বাবাকে বললাম, তোমার ছেলে এখন বড় হয়েছে। এমন কিছু করবে না যে তোমার মাথা হেট হয়। সত্যি বাবার মাথা হেট করিনি। বরং বিয়ের আগে শুধু বলেছি, ডিসেম্বরে বিয়ে করবো। প্রস্তাব নিয়ে যেও। (মেয়ে খোঁজার ঝামেলায়ও তাদের ফেলিনি)।
একদিন গ্রামের এক মাতব্বর কিসিমের লোক আমার মাকে বলে, তোমার ছেলে নাকি প্রেম করে! যেন প্রেম করাটা মস্ত বড় অপরাধ।
মার জবাব, হ্যাঁ করে।
কিছুদিন পরে ঐ মাতব্বরের ছোট মেয়ে পালিয়ে কোর্টে বিয়ে করেছে। মানুষের সামনে তিনি নিজেই ছোট হলেন।
আমাদের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথাই কানে আসতো। এইসব কথাগুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। প্রেম করার সময় আমার কখনোই মনে হয়নি আমি কোন অন্যায় করছি। আমার ভেতরে ছিলো না কোন শঠতা বা প্রতারণার মনোভাব।
আগেই ঠিক করা ছিলো ২০১০ সালে আমরা বিয়ে করবো। তাই প্রেম করার সময় বিয়ের জন্য সেই কত পরিকল্পনা! কিভাবে সংসার সাজাবো। সূচনাকে জিজ্ঞেস করতাম, বল না কিভাবে সংসার সাজাবে?
সে বলতো, জানি না?
পাল্টা প্রশ্ন তুমি বল??
এদিকে দু’জনই মনে মনে সাজিয়ে রাখতাম আমাদের স্বপ্নের ঘর। আমাদের ভালোবাসার ঘর।
এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। গীর্জায় আমরা পাঁচ জোড়া হবু দম্পত্তি। আমার হবু বৌকে বললাম, মনেই হচ্ছে না বিয়ে করতে যাচ্ছি। তোমার অনুভূতি কি?
সে মিষ্টি করে হাসলো। পরে শুরু হয়ে গেল বিয়ের পবিত্র খ্রীষ্টযাগ। পাঁচজন পুরোহিত পাঁচজোড়া দম্পত্তিকে বিয়ে পড়ালেন। বিয়ের প্রতিজ্ঞা/মন্ত্র বা কবুল তো অনেকই শুনেছি। এবার নিজেরটা!! তবে বিয়ের প্রতিজ্ঞার একটি জিনিস সব চেয়ে ভালো লেগেছে, “.. ..আমি তোমাকে রক্ষা করবো।” কত বড় কমিটমেন্ট! কত বড় দায়িত্ব!! অথচ এই মানুষটিকে আমি অজান্তে কতই না কষ্ট দেই!
বিয়েতে কত আত্মীয়-স্বজন, হৈ-হৈল্লোর নাচ-গান-খাওয়া-দাওয়া। তার পর বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ। শুধু দুটি নারী-পুরুষের এক সাাথে পথ চলা। এত আয়োজন শুধু এই দুটি মানব-মানবী এক সাথে পথ চলবে তাই অভিনন্দন-প্রার্থনা ও আর্শীবাদ জানানোর জন্য।
ফিরনি বা বৌ ভাতের দিন একটি আনুষ্ঠানিকতা আমার ভেতরে নাড়া দেয়। কন্যা বরের হাতে সঁপে দেওয়া। যাকে বলে কন্যা সম্প্রদান। আমার বোনের বিয়ের সময়ও এই অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা আছে। মেয়ের পক্ষের লোকেরা মনে করে মেয়েকে একবারের জন্য দিয়ে দিচ্ছি। আর পড়ে কান্না-কাটির ধুম। কন্যা সম্প্রদানের সময় পাত্রের হাতের উপর পাত্রীর হাত রাখা হয়, তার পর দুপক্ষের অভিভাবকরা হাত রেখে কন্যা দান করা হয়। সেখানে বলা হয় ওমুকের হাতে তুমুককে দান করা হলো। বিষয়টা আমার কাছে ভালো লাগেনি। যেখানে গীর্জায় বসে আমরা ঈশ্বরের সামনে মন্ত্র উচ্চারণ করেছি- সুখে-দুঃখে-স্বস্থ্যে-অস্বস্থ্যে আমরা একে অন্যকে ভালোবাসবে, রক্ষা করবো, সেখানে একজন নারীকে কেন পুরুষ দান হিসাবে গ্রহণ করবে??? হ্যাঁ আমার বৌকে আমি ভালোবাসার দান হিসেবেই গ্রহণ করেছি। কিন্তু তারপরও আমার কাছে এই সঁপে দেওয়া অনুষ্ঠানটা কেমন জানি লেগেছে। যেখানে নারী স্বাধীনতার জন্য এত আন্দোলন করা হচ্ছে সেখানে নারীকে ‘দান’ করাটা সত্যি হাস্যকর মনে হয় না কি? পাঠকদের কাছে আমার প্রশ্ন থাকলো? এটা পরিবর্তন করার প্রস্তাব রাখি।
বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমা। গেলাম সমুদ্র সৈকতে। নোনা পানিতে ¯œান করা, পানিতে দৌড়াদৌড়ি। ছবি তোলা। অনেক ঘোরলাম। মজা করলাম। সূচনা আমাকে বলে, আমরা তো এখনো সেরকমই আছি। মনেই হয় না বিয়ে করেছি।
বিয়ের আসল মজা ঝগড়ায়। প্রতিদিনই চেষ্টা করি যেন ঝগড়া না হয়। তারপরও হয়ে যায়। পরে আবার মিলন- এই মিলনে যে কত মধু তা সব দম্পত্তিরাই জানেন।
মানুষ এই যে এত আয়োজন করে বিয়ে করে। এর লাভ কী?
ডাক্তারগণ বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে বিয়ে করলে মানুষ দীর্ঘজীবী হয়। স্বাস্থ্য ভালো থাকে। মানসিক অস্থিরতা ও বিষণœতায় কম ভোগে। আর আমাদের ম-লির পুরোহিতগণ বলেনন, ঈশ্বরের সৃষ্টিতে সাহায্য করতে বিয়ে করা দরকার। পবিত্র বাইবেলে আছে, মানুষের একা থাকা ঠিক না.. .. সঙ্গীর প্রয়োজনেই তাই বিয়ে করা।
এদিকে ব্যর্থ দম্পত্তিরা বলেন, বিয়ে না করাই ভালো। আমি বিয়ে করেছি এখানো মাস হয়নি। বিয়ে কেন করেছি উপরের উত্তরগুলোই তার সম্মিলিত উত্তর। তবে এই এক মাসে সব সময় মনে হয়েছে আমি এখন আর আমি নই। হয়ে গেছি আমরা। আমার ভেতর আরেকজন বাস করে। আমার বৌ। নতুন সংসার জীবনে বার বারই মনে হয় বিয়ের প্রতিজ্ঞা “তোমাকে রক্ষা করবো” বিয়ের ক্লাশে ফাদার মিন্টু এল. পালমার শিক্ষা “প্রধান পেশা আদর্শ স্বামী হওয়া’ “ত্যাগ স্বীকার করা” “বিশ্বস্থ হওয়া” এই সব কথা। এগুলো নিজের জীবনে পালন করার চেষ্টা করি। সকলের দোয়া চাই যেন সাধু যোসেফের মত আদর্শ পরিবার গঠন করতে পারি। হতে পারি আদর্শ স্বামী ও আদর্শ পিতা।
স্মরণকালে বিয়ে উপলক্ষে এটাই কোন স্মরণিকা বা ম্যাগাজিন। বিপুলদার বিয়ে উপলক্ষে স্মরণিকা বের করার জন্য যারা সাহায্য করেছেন তাদেও কৃতজ্ঞা জানাই। যাকজাভিষেকের মত বিবাহও একটি পবিত্র সংস্কার। ইচ্ছা, সাধ্য আর সামর্থ থাকলে বিয়ে উপলক্ষে এই ধরনের স্মরণিকা প্রকাশ হওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন