।। সুমন কোড়াইয়া ।।
আমাদের গ্রামের বাড়িতে একটি কুকুর ছিল। নাম টমি। আমার খুব ভক্ত ছিল। সব সময় আমার সামনে এসে বসে থাকতো। আমি মাঝে মাঝে দুষ্টমি করে টমি যেন আমার মুখোমুখি না হয় তার জন্য অন্যদিকে ঘুরে বসতাম। টমি আমার মনোযোগ পাবার জন্য আমি যেদিকে তাকিয়েছি সেদিকে গিয়ে বসতো। আমি আবার অন্য দিকে ঘুরে বসতাম, টমি আবার আমার সামনে এসে মুখোমুখি বসতো। এভাবে খেলা চলতো বেশ কিছুক্ষণ। এরপর টমিকে আদর করে দিতাম।
শৈশবের সেই স্মৃতি হাতরে এখন বুঝি একটি অবলা প্রাণী টমি, সেও চায় মনোযোগ। চায় আমি তাকে কেয়ার করি। তার সাথে কথা বলি। তার সাথে যোগাযোগ করি।
বাস্তব জীবনেও আমরা দেখতে পাই, আমাদের মনোযোগ পাবার জন্য চারপাশের মানুষ কত রকম কথা বলছে। তারা কেউ পরিবারের কেউ পরিবারের বাইরের, কেউ কর্মক্ষেত্রে, কেউ হয়তো আমাদের অপরিচিত, কিন্তু আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অনেক মানুষই বলছেন। এখন প্রশ্ন: আমরা কতটুকু মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনছি?
আসুন শ্রবণ করি: ধরুন, আমাদের পরিবারে ছোট কোনো সদস্যে রয়েছে। তার গায়ের কোন অংশে সামান্যতম আচড় লাগলে বা কেটে গেলে, সেই ছোট্ট শিশু তা আমাদের দেখায়, একটু সহানুভূতি ও আদর পেতে চায়। আমরা তাকে সহানুভূমি ও আদর দেই।
পরিবারের সমবয়সীরাও তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা, অর্থ কষ্টের কথা, চাকরি না থাকার কথা, সংগ্রামের কথা, অসহায়ত্বের কথা, দাম্পত্য কলহের কথা, অসুখের কথাসহ অনেক সমস্যার কথা আমাদের বলে। আমরা যদি তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি ও সমবেথি হই, কিছু করার সামার্থ থাকলে, তাদের সাহায্য করি বা তাদের প্রতি অবদান রাখি, তাহলে তারা নিশ্চয় বুঝবেন আমি তাদের গুরুত্ব দিয়েছি। একইভাবে পরিবারের বড়ো কোনো সদস্য বারা বার একটি সমস্যার কথা বলেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না, তাহলে তিনি আমার ওপর বিরক্ত হবেন। আমার ওপর তার কোন প্রত্যাশা থাকলে সেই প্রত্যাশা পূরণ হলো না বলে আমার সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হবেÑ এটাই স্বাভাবিক।
পরিবারের সদস্য ছাড়াও আমাদের সারাদিন অনেকের কথা শুনতে হয়। তারা হয়তো থাকে রাস্তা ঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, বাস স্টেশনে, কোন সভা সেমিনাসহ বিভিন্ন স্থানে। সেই ক্ষেত্রে শ্রোতা হিসেবে আমাদের ভূমিকা কী হয়ে থাকে? আমরা হয়তো ফুটপাতে যিনি দশ টাকা সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে হাত পেতেছেন, তার জন্য দয়া হয় বলে দশটাকা বা সাধ্য মতো দান করি বা হয়তো করি না।
কর্মক্ষেত্রে উর্ধ্বতন বা অর্ধস্তন ব্যক্তিদের সাথে কথা হয়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে হয়ত ভালোভাবে কথা বলি ও তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি, না বুঝলে বলি বুঝি নাই, পুনরায় শুনি। তবে অর্ধস্তন কর্মীর সাথে কতটুকু মনোযোগ দিয়ে শুনি ও তার সাথে সেই মতো ব্যবহার করি এই বিষয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতে পরি। পবিত্র বাইবেলের মার্ক ৪:২৪ উল্লেখ রয়েছে, ‘আর তিনি তাহাগিদকে কহিলেন, তোমরা দেখিও, কি শুন; তোমরা যে পরিমাণে পরিমাণ কর, সেই পরিমাণে তোদের নিমিত্ত পরিমাণ করা যাইবে; এবং তোমাগিদকে আরও দেওয়া যাইবে।’ আমরা এই বিষয়টা মাথায় রাখতে পারি।
আমরা আরও কথা শুনি রেডিও টেলিভিশনে, দৈনিক পত্রিকায়, রাস্তাঘাটে, সভা-সমাবেশে, মিছিলে। সব কথা হয়তো আমাদের শুনার প্রয়োজনও হয় না, তারপরও আমরা শুনি, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তবে সেই কথার গুরুত্ব বুঝার ক্ষমতা আমাদের অনেকের থাকে, অনেকের থাকে না। সেই শুনার মধ্যেও ভুল তথ্য থাকতে পারে, ভুল বার্তা থাকতে পারে। তাই তা যাচাই বাছাই করতে পারি ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারি।
শ্রবণের অভাবে যত সমস্য: শ্রবণের অভাবে অনেক সমস্যার সম্মুখিন হতে হয় আমাদের। সামাজিক জীবনে একটি বড়ো সমস্যা হচ্ছে ইগো (বমড়)। নিজেকে বড়ো মনে করা। যার দরুন আমরা অনেক সময় যার সাথে আমার বনিবনা হচ্ছে না তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই। এতে কিন্তু সমস্য ছোট হচ্ছে না বরং সমস্যা বড়ো হচ্ছে। আমার মনে কী, আর তার মনে কীÑ তা আমরা কেউ বুঝতে পারছি না। সেজন্য, আমরা যদি কাউকে পছন্দ নাও করি, কারো সাথে বনিবনা নাও হয়, তাদের কথা মনে যোগ দিয়ে শুনা উচিত। শুনে ভেবে চিন্তে উত্তর দিতে হবে।
আমরা যদি কারো সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই তাহলে প্রথমে ভুলবুঝাবুঝি হবে ও পরে দ্ব›দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হবে। তাই আমাদের শ্রবণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। সুযোগ নষ্ট হবে। বন্ধ হবে অনেকে অবারিত সুযোগের জানালা।
শ্রবণের তাৎপর্য: ব্যস্তময় এই পৃথিবীতে আমরা এখন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সবার হাতে মোবাইল। আমরা রেস্টুরেন্টে প্রিয়জনদের নিয়ে খেতে গেলেও সেখানে ভাগ বসায় সোসাল মিডিয়া। আমরা লাইক, কমেন্ট, ফলোর পিছনে ছুটছি সবাই। সন্তানরা মোবাইলে গেম খেলছে, ইউটিউব নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। সবাই ব্যস্ত। মহা ব্যস্ত। এই ব্যস্ততা কমবে কবে? এই লাগাম কে টানবে? এই লাগাম টানার সময় এসেছে এখনই। আমরা ভার্চুয়ালী অনেক বেশি কানেকটেড থাকলেও বাস্তবে সম্পর্কের সুতাগুলো মজবুত করতে পারছি না।
ধুরুন, আপনি হাসপাতালে শয্যাশায়ী আপনার অনেক স্বজন আসলো, আপনার সাথে কথা বললো, আপনার ভালো লাগলো। কিন্তু আপনার সাথে কেউ দেখা করতে আসলো নাÑ আপনার কেমন লাগবে? নিশ্চয় কষ্ট হবে। যারা মানসিকভাবে কষ্টে থাকেন, তাদেরও প্রয়োজন হয় কথা বলার কেউ। নিজের কথা বলে ‘হালকা হওয়া’ বড়ো একটি ‘হিলিং’ হতে সাহায্য করে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলে, দেশের মানুষের মধ্যে হতাশা, নিরাশা বেড়েছে। দেশে বিগত কয়েক বছরে আত্ম-হত্যার হার বেড়েছে কয়েকগুণ। অনেক মানুষ মনের কথা সহভাগিতা করতে না পেরে, নিজেকে নিজে শেষ করে দিচ্ছে। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পরিমাণ ছিল ১০১ জন, ২০২২ তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৫৩২ জন। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ৪২ জন এবং এক বছরের মাথায় ২০২২ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ জন। আত্মহুতি দেওয়া ৬০ ভাগই ছিল নারী।
আত্মহত্যার কারণ হিসেবে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, মনের কথা সহভাগিতা করতে না পারা, হতাশা, পড়াশোনার চাপ, মান-অভিমান, প্রেম ঘটিত বিষয়, মোবাই না কিনে দেওয়া, মোটর সাইকেল কিনে না দেওয়া, যৌন হয়রানী, আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি। তথ্যগুলো তারা সংগ্রহ করে দেশের দেড়শতাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টাল থেকে।
তাই সন্তানদের সাথে আমাদের প্রচুর কথা বলতে হবে, তারা কী বলতে চায় তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। হয়ে উঠতে হবে তাদের বন্ধু।
সারা পৃথিবীতেই প্রিজন মিন্ট্রিষ্টি (কয়েদিদের জন্য বিশেষ সেবা) খুব জনপ্রিয় । আমাদের দেশের খুবই স্বল্প পরিসরে এই কাজটি কেউ কেউ করে থাকেন। আমার একবার সুযোগ হয়েছিল গাজীপুরের কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি প্রিজনে যাওয়ার। সেখানে গিয়ে দেখেছি, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কতটা অসহায় দিন পার করছেন। তারা যখন স্বজনদের সাথে বা কেউ তাদের সাথে দেখা করতে গেলে, তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা সহভাগিতা করতে পারেন, তারা মনে অনেক শান্তি পান।
আমরা হয়ত জেলে গিয়ে খুব সহজে কয়েদিদের কথা শুনতে পারবো না। তবে খুব খেয়াল করলে দেখবো, পরিবারে, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বা প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকে কথা বলতে চায় কিন্তু তাদের শুনার কেউ না। আমরা দিনে বা সপ্তাহে একটিবার কী তাদের সাথে মুখোমুখি বসে বা মোবাইলে কথা বলতে পারি না যেন তারা মনের দুঃখের কথা বলে, মনের আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো ঝড়িয়ে হালকা হতে পারে?
পরিশেষে, আমরা কিছু কথা শুনি সোসাল মিডিয়া ঘেটে, সেটা হয়তো কারো উদ্ধৃতি, কবিতা, গান, গল্প বা মটিভেশনাল কথাবার্তা। আমার কেন জানি মনে হয়, যারা এই শোনার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়, তারা অনেক বেশি সমৃদ্ধ হন। অনেক বেশি কিছু জানেন। জ্ঞান লাভ করেন।
আমরা যদি শুধু বলতে যাই, তা হয় এক পাক্ষিক, অন্য দিকে, অন্যে কী বলতে চায়, তা আমাদের শোনা উচিত। আমরা একে অপরের কথা শুনে, পরে নিজের বিবেকের কথা শুনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এভাবেই আমরা এই পৃথিবীর সকলে এক পরিবারের সদস্য হিসেবে এক সাথে পথ চলতে পারি। গড়তে পারি একটি শান্তিময় বিশ্ব।
লেখাটি কারিতাস বাংলাদেশ-এর ত্যাগ ও সেবা অভিযানের প্রকাশনা ‘বিনিময়’ এ পূর্বে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন