সোমবার, ২৭ মার্চ, ২০২৩

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় যেভাবে বিপদের বন্ধু

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় যেভাবে বিপদের বন্ধু


।। সুমন কোড়াইয়া ।।


(১)

কারিগরি থেকে অটোমোবাইল পাস ঝোটন সাভারের একটি বেসকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। স্ত্রীসহ এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার। কিন্তু অর্থ ব্যবস্থাপনায় ঝোটন হাঁদসার সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়। ডিসেম্বরে উত্তরবঙ্গের গ্রামের বাড়িতে বড়দিন করতে যাওয়াটা তার জন্য অনেক কষ্টের। বেশ কয়েক বছর বড়দিনে তার বাড়িতেই যাওয়া হতো না,  এতে আত্মীয়-স্বজনরা কষ্ট পেতেন। কষ্ট পেতেন তিনি নিজেও। কারণ জানুয়ারিতে ছেলে-মেয়েকে ভর্তি করাতে তার চলে যায় বিশ হাজারের বেশি টাকা। বড়দিনে বাড়িতে গেলে ছেলে-মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে তাকে হিমসিম খেতে হতো। তার বন্ধু পংঙ্কজ তাকে একটা বুদ্ধি দিলেন। সেটা হলো ঢাকা ক্রেডিটে উৎসব সঞ্চয় প্রকল্পের একটি হিসাব খুলতে। তিনি সেখানে প্রতি মাসে উৎসবের জন্য কেনা কাটা করার জন্য দুই হাজার টাকা সঞ্চয় করতে লাগলেন। বছর শেষে দেখা গেল তিনি উৎসব সঞ্চয় প্রকল্প থেকে চব্বিশ হাজার টাকা সুদ সহ পেলেন। এই বছর বৃদ্ধ মা-বাবা ও অন্যান্য ভাইবোনদের নিয়ে নিশ্চিন্তে বড়দিন উদযাপন করলেন। অফিস থেকে পাওয়া বোনাসের টাকা দিয়ে জানুয়ারিতে ছেলে-মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর পরও তার কয়েক হাজার টাকা বেশিও হবে। বন্ধু পংকজের পরামর্শ তার জীবনের জন্য হয়ে উঠলো আশীর্বাদের। 

(২) 

রূপন গমেজ। একটি এনজিওতে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বেতন খুব বেশি না। তার অফিসে যেতে বাসে ও রিক্সায় সময় লাগে এক ঘন্টা। ঢাকা শহরের যানজটের কারণে মাঝে মাঝে সময় লাগে দেড়ঘন্টা। তিনি যে বেতন পান তাতে সংসার চলাতে কষ্ট হয়। বাসে অফিসে যেতে আসতে খরচ হয় ৫০ টাকা। তিনি অফিস শুরুর দুই ঘন্টা আগে বাসা থেকে বের হতে শুরু করলেন এবং হেঁেটই অফিসে পৌঁছালেন আরো বিশ মিনিট আগে। একই ভাবে তিনি হেঁটেই বাসায় ফিরতে শুরু করলেন। রূপন সব সময় হেঁটে যান না, তবে বেশির ভাগ সময়ই হেঁটে অফিসে যাওয়া আসা করেন। এভাবে মনের প্রচÐ শক্তির জোরে তিনি প্রতি মাসে অন্তত ৫শ টাকা জমা করেন একটি সমবায় সমিতির সঞ্চয়ী হিসাব নম্বরে।

প্রায় ছয় মাস পর তার সন্তানের হঠাৎ অসুখ হয়। তখন তিনি কারো নিকট হতে টাকা ধার না করেই জমানো টাকা দিয়ে ছেলেকে চিকিৎসা করাতে পারলেন। রূপন তার টাকা জমানোর ধারা অব্যহত রেখেছেন। তিনি শুধু হেঁটেই নয় কিন্তু সপ্তাহে একবার কম কাঁচাবাজার করে আরও ৮০-৯০ টাকা জমা করে করেন। তিনি মাসে অন্তত ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা জমা করেন। বিপদে আপদে আত্মীয়-স্বজন নয়, বরং সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে জমানো টাকাই তার বন্ধু।


(৩) 

কল্পনা রোজারিও’র গল্পটা অন্য রকম। তিনি গৃহিনী। তার কাজ রান্না-বান্না করা, ঘর পারিষ্কার করা, সন্তানকে খাওয়ানো, পড়ানো, যতœ নেওয়া। তার স্বামী সকালে অফিসে যান, বাসায় ফিরেন রাত আটটার পর। স্বামীর একা আয়ে ভালোভাবে সংসার চলে না। ছেলের বায়না মেটাতে হিমসিম খেতে হয় তাদের। ছেলে স্কুলের ফি দিতে কষ্ট হয়। অনিতা চিন্তা করতে শুরু করলেন কীভাবে তিনি সঞ্চয় করতে পারেন। তিনি বাজার করার দায়িত্ব নিলেন। তিনি ভেবে দেখলেন, তার স্বামী বাজার করলে বেশি বেশি বাজার করতেন এবং প্রায় সময়ই সেগুলো অপচয় হতো। তিনি বাজার করার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতি মাসে অন্তত ৫ শ টাকা বাঁচাতে পারেন। তিনি সেগুলো একটি মাটির ব্যাংক টোপায় রাখা শুরু করলেন। বছর শেষে দেখা গেল, তিনি ছয় হাজার টাকা জমিয়ে ফেলেছেন। গতবার ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে স্কুল থেকে সবায় যখন শিক্ষা সফরে গিয়েছিল, তখন টাকার অভাবে কল্পনা ছেলেকে পাঠাতে পারেননি। এবার জমানো টাকা থাকায় সাভারের সাফারি পার্কে স্কুল থেকে আয়োজিত শিক্ষা সফরে ছেলে কল্পনা সহ গেলেন নিশ্চিন্ত। জমানো টাকাই অনিতার আশির্বাদ হয়ে উঠলো।

(৪)

একটি এ্যম্বাসীতে কাজ করেন নিটোল রায়। বেশ ভালই মাইনে পান তিনি। তিনি ব্যাংকের সাথে এমন একটি চুক্তি করলেন যে তার বেতনের একটা অংশ একাউন্ট থেকে তার নামে নির্দিষ্ট পরিমাণে সঞ্চয় হবে। বছর শেষে তিনি সেই টাকাটি তুলে ঋণ ছাড়াই বড় একটা কিছু করতে পারেন। স্ত্রী বা বৃদ্ধ-বাবা মা অসুস্থ হলে কারো কাছে হাত না পেতেও তিনি খরচ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

নিচে টাকা জমানোর ১৬টি কৌশলের কথা উল্লেখ করা হলো:

১। আপনি বা আপনার সঙ্গী হয়তো বাইরে খেতে পছন্দ করেন। বাইরে খাওয়াটি কমিয়ে ফেলুন। প্রতি সপ্তাহে বাইরে খেতে যাওয়ার পরিবর্তে মাসে একবার খেতে যান। এভাবে বাইরে খাওয়া বন্ধ করে টাকা জমান।

২। আমাদের ঘরে অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস থাকে। এসব জিনিস শুধু ঘরের জঞ্জাল বৃদ্ধি করে। দরকারি জিনিস ছাড়া অপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে দিন। বিক্রি করে টাকাটা জমা করে রাখুন।

৩। মাটির ব্যাংকের কথা মনে আছে? কিনে ফেলুন একটা। এখানে খুচরা বা ভাংতি টাকাগুলো জমা করে রাখুন। মাঝে মাঝে রাখতে পারেন হাজার টাকার নোটও। বছর শেষে দেখবেন বেশ ভালই জমা হয়েছে। এই টাকাই আপনার বিপদের বন্ধু। 

৪। আমরা টাকা খরচের হিসেব রাখি না। তাই কখন, কোথায়, কী কারণে খরচ করছেন তার হিসাব রাখুন। দেখবেন, হিসাব রাখলে অতিরিক্ত খরচ কমে যাবে এমনি এমনি। তাই খরচগুলো খাতায় বা ডাইরিতে হিসেব রাখুন।

৫। যতটা সম্ভব হাঁটুন। হাঁটলে যেমন রিক্সা ভাড়া, বাস ভাড়া বাঁচবে তেমনি টাকাও সঞ্চয় করতে পারবেন। স্বাস্থ্যও ভাল থাকবে। চিকিৎসকের নিকট বার বার যেতে হবে না। ফলে কমে যাবে চিকিৎসা ব্যয়। এভাবে টাকা সঞ্চয় করতে পারবেন।

৬। বাইসাইকেল চালান। এতে যাতাযাত ভাড়াটা সঞ্চয় করতে পারবেন। বাইসাইকেলে সপ্তাহান্তে বাজারও করতে পারবেন, যেখানে বাজার করে তা বাসায় আনতে রিক্সা ভাড়া বা সিএসজি ভাড়া লাগতো, সেটা বাইসাইকেল বাঁচিয়ে দিবে। এছাড়া সাইকেল চালালে যেমন বিনোদন পওয়া যায়, তেমনি অতিরিক্ত ওজনও কমে। হৃদ রোগের ঝুকি কমে। দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। 

৭। ফাস্টফুড খাওয়া কমিয়ে দিন। কফি, বার্গার, পিৎজা, আইসক্রিম ইত্যাদি জাঙ্ক ফুড কম খেয়ে সে টাকা জমাতে পারেন।

৮। নেশা জাতীয় খাবার যেমন সিগারেট, মদ, পান সহ যাবতীয় নেশা জাতীয় খাবার বর্জন করন। প্রথমেই না পারলে, ধিরে ধিরে বর্জন করুন। যেখানে বন্ধু-বান্ধবরা নেশা জাতীয় খাবার নিয়ে আড্ডা দেয় সেখানে যাওয়া বাদ দিন। ভালো বন্ধুরা কখনো জোর করে নেশা জাতীয় কিছু খাওয়াবে না।

৯। সব মানুষেরই সীমাবদ্ধতা থাকে। সংসারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে জীবন সঙ্গী তথা সন্তানদের সাথে সহভাগিতা করুন। তাদের বলুন এই মাসে এত আয়; এই টাকা দিয়েই মাস চলতে হবে। আপনার সঙ্গী, সন্তানরা আপনার আর্থিক অবস্থার কথা জানা থাকলে তারাও খরচের ব্যপারে সজাগ থাকবেন। 

১০। অনেক সময় সন্তানরা অপ্রয়োজনীয় কোন জিনিসের জন্য বায়না করে। তাদের বুঝান যে এটা না হলেও চলবে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী সেটা তাকে কিনে দিন। ফলে আপনার টাকা যথাস্থানে খরচ হবে। 

১১। অনেকে অতিরিক্ত বড়ো বাসায় ভাড়া থাকেন। প্রয়োজন না হলে বড়ো বাসা না নেওয়াই ভাল। আপনার পরিবারের জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেরকম দেখে কোন বাসা পছন্দ করুন। প্রয়োজনে সাবলেট নিন। এতে খরচ কমবে। বাসা আপনার অফিস, বা বাচ্চাদের স্কুলের কাছে হলে আরও ভালো।

১২। বাসাতে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে লাইট, ফ্যান, এসি অন করে রাখবেন না। দেখবেন মাস শেষে বিদুৎ বিল কম এসেছে।

১৩। কারো জিনিসপত্র দেখলেই নিজেরও সেরকম কিছু কিনতে হবে, এই মন মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কেউ দশ হাজার টাকা দামের শাড়ি কিনলে আপনাকে বার হাজার টাকা দামের শাড়ি কনতে হবে এই চিন্তা ধারা বাদ দিতে হবে। কম দামে রুচিশীল শাড়ি বা পোশাক কিনুন।

১৪। বাজার করতে যাওয়ার আগে তালিকা তৈরি করুন। তাহলে অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা থেকে বিরত থাকবেন।

১৫। বারান্দা কিংবা ছাদের এককোণে সবজি বাগান করতে পারেন। এই ছোট বাগানটি সবজি কেনার খরচ কমিয়ে দেবে। এটা যেমন আপনার খরচ কমাবে তেমনি আপনার অবসর সময়ে হালকা পরিশ্রম করারও একটা সুযোগ তৈরি করবে।

১৬। সপ্তাহের একটি দিন ঠিক করুন আপনি বাসা থেকে কোথাও বের হবেন না, ঘরে যা আছে তা দিয়েই দিন চালিয়ে দিবেন, দেখবেন খরচ কমেছে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন