|| সুমন কোড়াইয়া ||
উঠানের ধারে মস্ত বড় একটা হাসনাহেনার গাছ। জ্যোৎস্না ঝরা এ রাতে যেন হাসনাহেনার সুরভি ˜িগুন হয়েছে। আকাশে বাদুর উড়াউড়ি করছে। অনেক দূরে আকাশে নক্ষত্ররা মিটিমিটি জ্বলছে। কখনো কখনো কালো মেঘ নক্ষত্রদের ঢেকে ফেলছে। কালো অন্ধকার থেকে চাঁদের জ্যোৎস্না পৃথিবীতে ছুটে আসছে এবং হাসনাহেনাকে দ্বিগুন সুরভিত করছে।
সেতু উঠানে শীতল পাটি মেলে দিল। মিন্টু সন্ধ্যা প্রার্থনার বই, বাইবেল নিয়ে উঠানে শিতল পাটিতে বসল। আকাশ দেখা বাদ দিয়ে আমিও গিয়ে বসলাম। সেতু রানুদিকে ডাক দিল সন্ধ্যা প্রার্থনা করার জন্য। রানুদি বললো, আমি ঘরে বাবার কাছে বসে প্রাথূনা করবো। তোমরা বাইরে প্রার্থনা কর। মিন্টু প্রার্থনা শুরু করল এবং প্রার্থনার ভূমিকায় বলে দিল প্রার্থনার বিষয়। বাবা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। বাবার ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তার আমাকে আর দুলুদাকে একদিন ডেকে নিয়ে এ কথা বলেছিলেন। দুলুদা এ বাড়িতে প্রায় সাত বছর ধরে থাকেন। বাবার দূর সম্পর্কের বোনের ছেলে। এ বাড়িতে থেকেই তিনি বি.এ এবং বিএড পাশ করেছেন। এখন আমাদের বনপাড়া হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক। তিনি গণিত পড়ান। আমাদের বাড়িতে থেকে তিনি আমাদের পড়াতেন। এছাড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন ছাত্র তার কাছে টিউশনি পড়তে আসতো। দুলুদার (দুলাল থেকে দুলু সংক্ষিপ্ত নাম) স্কুলে চাকরী হবার পর তার এখন আরো অনেক ছাত্র-ছাত্রী হয়েছে। ছাত্রদের পড়ানোর সুবিধার জন্য বাবা একটি ঘর করে দিয়েছেন। ঘরটির দরজার সামনে সাইনবোর্ডে লেখা ‘নিরিবিলি টিউটোরিয়াল হোম’। নিরিবিলি লেখা থাকলেও প্রায়ই ছাত্রদেরকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে হয়। তবু ছাত্ররা আসে। কারণ দুলুদা ছাত্র মহলে ‘অংকের জাহাজ’ নামে পরিচিত।
প্রার্থনা শেষ করে আমরা ভাই-বোনেরা বাবা-মার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে গেলাম। ঘরে গিয়ে দেখি বাবার অবস্থা আরো খারাপ। চোখ মুখ একদম হলুদ হয়ে গেছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বাবা কথা বলতে পারছেন না কেন? চোখ দিয়ে ইশারা করছেন কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছেন না।
এ বাড়িতে দুলুদা অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে থাকেন। তার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নেয়া দরকার। মিন্টুকে বললাম, যা দুলুদাকে শীঘ্রই ডেকে আন। বল বাবার অবস্থা খুব খারাপ। মিন্টু দৌঁড়ে গেল। রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে। অল্প সময়ের মধ্যে দুলালদাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরল। মা কান্না শুরু করে দিয়েছেন। সেই সাথে সেতু ও রানুদি। আমি বললাম, তোমরা কেঁদো না। শোন বাবা কি যেন বলতে চাচ্ছেন। সবাই চুপ হয়ে বাবার কথা শোনার চেষ্টা করছে।
সেতুকে কাছে ডেকে বাবা আদর করলেন। রানুদি বাবার সবচেয়ে আদরের বড় মেয়ে। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন। বাবা মিন্টুকে হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকলেন। মিন্টু বাবা বাবা বলে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। সে বললো, বাবা বল তুমি আমার কাছ থেকে কি চাও? আমি তোমার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। বাবা কিছুই বলতে পারলেন না। তবে চোখের ভাষায় কি যেন বললেন। আর রানুদিও হাত শক্ত করে ধরে রাখলেন।
এবার আমার পালা। দেখলাম বাবার চোখের কোণে ভোরের স্নিগ্ধ শিশিরের মত বিন্দু অশ্র“ জল। বাবার কাছ থেকে আশির্বাদ নিলাম। মা আমাকে তাড়া দিয়ে বললেন, কিছু একটা কর। দুলুদাকে নিয়ে ঘরের বাইরে গেলম। তাকে বললাম ডাক্তার ডাকা দরকার। বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হয় হাসপাতালে নিলেই ভাল হয়। আমাদের পাশের বাড়িতে মি. জন থাকেন। বাবার বাল্য বন্ধু ছিলেন।
মি. জনের রাজপ্রাসাদের পাশেই আমাদের ছোট্ট বাড়ি। কোন জরুরী দরকার হলে মি. জনের বাড়িতে যাই ফোন করতে। তাদেও বাড়িতে ল্যান্ড ফোন আছে। সেই বাড়ি থেকে ফোনে আমাদের এলাকার নামকরা রঞ্জিত ডাক্তারকে বাবার অসুখের কথা জানালাম। অনেক আগে থেকেই এই ডাক্তার আমাদের পরিবারের চিকিৎসা সেবা করে আসছেন। খবর পেয়েই তিনি আসবেন বলে প্রতিশ্র“তি দিলেন। ফোনে কথা শেষ করে বিষণœ মুখে ঘর থেকে বের হচ্ছিলাম। মি. জনের স্ত্রী সর্মিলা মাসি আমাকে ডাকলেন। হাত বাড়িয়ে একটা পেকেট দিয়ে বললেন, এটা রাখ। কাজে লাগবে।
না থাক।
কেন? ধর। অধিকারের সুরে বললেন।
ধন্যবাদ। হাত বাড়িয়ে পেকেটটা নিলাম।
কৃতজ্ঞতায় ভরা নয়নে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আগেও বাবার অসুখের সময় টাকা দিয়ে উপকার করেছেন। কিন্তু তা আর ফেরত দিতে পারি নি। জানি না কবে ফেরত দিতে পারবো। তবে এ বাড়িতে মানুষদের ভালবাসা পেয়ে আমাদের বাড়ির সবাই যেন এ বাড়ির অধীনে হয়ে গেছি। আমাদের পরিবারের সবাই এ বাড়ির অধীনে হয়ে গেছি। আমাদের পরিবারের সবাই এ বাড়ীর সবাইকে সমীহ করে। কিছুক্ষণের মধ্যে মোটরসাইকেলে ডাক্তার এসে গেছেন। বাড়িতে গিয়ে দেখি বাবাকে চারপাশে সবাই দাঁড়িয়ে ও বসে আছে। পাাশের বাড়ি থেকে আমার জ্যাঠা-জ্যাঠিমা এবং তাদের ছেলে-মেয়েরা এসেছে। জ্যাঠা খুব ধার্মিক মানুষ। বাবার অবস্থা খারাপ দেখে প্রার্থনা করতে লাগলেন। প্রার্থনার মধ্যেও মৃদু কান্নার শব্দ শুনা যাচ্ছে।
সবাই প্রার্থনায় ব্যস্ত থাকলেও ডাক্তার তার কাজ করে যাচ্ছেন। পর পর দুটা ইনজেকশন পুস করলেন। প্রেসার মাপলেন এবং একটা স্যালাইন শরীরে লাগিয়ে দিলেন। তিনি নিশ্চুপে কাজ করে যাচ্ছেন। মিন্টু বাবার পা ধরে প্রার্থনা করছে। রানুদি বাবার মাথার কাছে, পাশে মা এবং ছোট বোন সেতু বসা।
সেতু প্রার্থনার বইটি থেকে রোগীদের মঙ্গল প্রার্থনাটি করলো। বাড়িতে আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীরা অনেকে আসলো। এক মালা প্রার্থনা শেষ হল। তখন বাবা বললেন, স্বর্গের..রা..ণী মা মারীয়া..। আমরা তো বাবার কথা শুনে অবাক! তিনি গানটি গাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। একটু গাইলেন। ফ্রান্সিস জ্যাঠা সবাইকে বলেন, স্বার্গের রাণী গানটা উঠাও। কে একজন শুরু করেছে। বাবার অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। সবাই কেঁদে কেঁদে গাইলেন-
স্বর্গেও রাণী মা মারীয়া
মর্তের রাণী মা মারীয়া
যেও না কোথাও মাগো তুমি আমারে ছাড়িয়া।
এই পাপময় সাগরে মা গো
আমি একা পড়ে আছি।
তাই মা আমি সর্বদাই
তোমার দয়া যাচি।
***
সবাই কেঁদে কেঁদে গভীর ভক্তি সহকারে মা মারীয়ার নিকট গান ও প্রার্থনা করে শেষ না হতেই দেখছি বাবা কাঁপতে কাঁপতে মরে যাচ্ছেন। আমরা কেউ কিছুই করতে পারলাম না।
বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পরিবারের সবার মন খুব খারাপ। মা খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। মিন্টু খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। অথচ বাবা মারা যাওয়ার আগে সে বাড়িটা মাতিয়ে রাখেছে। খুব হৈ হুলা করতো। রানুদিও এখন একটু চুপচাপ। শুনলাম প্রতিদিন বিকালে সে ও সেতু বাবার কবরে ফুল দিতে যায়। বাবার অনুপস্থিতি সত্যিই আমাদের বাড়িটা কেমন পাল্টে গেছে। পরিবারের কেউ মারা গেলে প্রতিটা পরিবারেই হয়ত একটু না একটু বদলে যায়। আমি বুঝলাম বাবার মৃত্যুতে আমাদের ভিটার সবাই খুব নীরব-নিঃস্তেজ হয়ে গেছে। ভাবার সংসার তীরের বৈঠাার হাল ধরতে হবে। হাল ছেড়ে দিলে তো আর চলে না। তাই সবাইকে আমি আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সবাই কেমন যেন নিরস হয়ে গেছে। দুলুদাও বাবার মৃত্যুর কারণে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েছেন স্কুল থেকে। এই কয়েকদিন তিনি টিউশনিও পড়াবেন না বলে সবাইকে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্বল্প ভাষী মানুষ। তার শখ বই পড়া এবং রাতের তারা ভরা আকাশ দেখা। বাবা মারা যাবার পর এই স্বল্পভাষী মানুষটা যেন আরো নির্বাক হয়ে গেছেন। সারা দিন ঘরে বসে থাকেন। সন্ধ্যায় রাতের আকাশ দেখতে উঠানে হাসনা হেনা গাছের কাছে বাঁশের তৈরী মাচায় বসে থাকেন । প্রয়োজনীয় একটা-দুটা কথা ছাড়া কারো সাথে কথা বলেন না। তাই তাকে আমার খুব রহস্যময় মনে হয়। তাকে অবশ্য আগে থেকেই আমার কাছে রহস্যময় মনে হতো। এখন একটু বেশী মনে হচ্ছে। হয়ত চুপচাপ মানুষকে সহজেই এ রকম মনে হয়।
আপন জন মারা গেলে কষ্টে নাকি বুকটা ভারি হয়ে থাকে। আমি তেমন কিছু অনুভব করলাম না। আমাদের এত প্রিয় বাবাকে হারিয়েও আমার বুকে গাঢ় ব্যদনার মেঘ ভিড় করেনি। বরং আমার সারা হৃদয়ে কেবল চিন্তা আমি সংসারের হাল ধরবো কিভাবে? আমি বড় ছেলে। বাবা কোন রকম গৃহস্তালি করে সংসার চালাতেন। কখনো বড় গৃহস্ত বাড়িতে কামলা যেতেন। জমিতে যেটুকু হয় তা সারা বছর ঘরেই লাগে। বাড়ির ফলমূল বিক্রি করে বাবা বাজার সদাই করতেন। মা প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। এখন সংসারের দায়িত্ব সর্ম্পন আমার উপর পড়েছে। গ্রামে দুটা টিউশনি করি। নিজের পড়ার খরচ নিজেই চালাতাম। এখন সংসারও চালাতে হবে। চিন্তায় মাথা ভারি হয়ে আসে। চারদিকে অন্ধকার দেখি। সেই অন্ধকারে ভেসে উঠে বাবার মুখ। তার মুখময় হৃদয়ে ভাসলেই মনে হয় কি কষ্টে মারা গেছেন তিনি। চিকিৎসার অভাবে বাবা নিদারুণ কষ্টে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আর মাত্র দুটাটা বছর তারপর এমএ পাস করলেই চাকরীর জন্য শহরে যাবো। এই আশা বাড়ির সবার।
***
মিন্টু ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিল। খুব ভাল ভাত্র সে। সবার আশা সে এসএসসি’র মত অ+ পাবে। মিন্টুকে নিয়ে বাবার অনেক অনেক স্বপ্ন ছিল। বাবার স্বপ্ন দেখতেন- মিন্টু তার ছোট এ ঘরে আলো জ্বালাবে। লেখাপড়া করে বড় হবে। বাবা সন্ধ্যায় প্রার্থনার আগে মিন্টুকে খুব বলতেন মিন্টু যেন পুরোহিত হয়। কিন্তু মিন্টুর ইচ্ছা আছে কিনা তা বুঝা যায় না। ফাদার হওয়ার মত ইচ্ছা সে নিজে আমাদের কখনো ব্যক্ত করে না। কাথলিক খ্রিস্টান ফাদারা কখনো বিয়ে করতে পারে না। তাদের কুমার্যতা, বাধ্যতা ও দারিদ্রতার ব্রত নিতে হয়
দুলুদার মত সেও খুব বই পড়ে। বাড়িতে কাজ না থাকলে সারাদিন খুব বই পড়েব। বাই পড়তে নাকি তার খুব ভাল লাগে। বনপাড়া গির্জার লাইব্রেরী থেকে বই আনে। বই পড়তে নাকি তার খুব ভাল লাগে। গায়ের রংটাও ভাল। ইর্ষা করার মত চেহারা পেয়েছে ও। রানুদি ও মিন্টু বাবার মত সাদা দুধের মত রং পেয়েছে। আমি আর সেতু হয়েছি মার মত শ্যাম বর্ণের। আমরা দেখতেও নাকি মার মত।
মিন্টু খুব লাজুক স্বভাবের ছেলে। পাড়া প্রতিবেশীরা বৌদি, কাকিরা মিন্টুকে প্রায়ই বলে, মিন্টু তো যে সুন্দর নাক, টানা টানা চোখ, ভ্র“ দেখতে। তোকে একদম রাজপুত্রের মত লাগে। শুনলে মিন্টু লজ্জ্বায় লাল হয়ে যায়। বৌদিরা বলে কি দেবর মশায় এমন দর্শনীয় চেহারা নিয়ে ফাদার হলে মেয়েরা চোখ লাগাবে তো। ফাদার হয়ো না। রাজি থাকলে আমার ছোট বোনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে পারি। এই সব কথা অবশ্য বাবা বেঁচে থাকতে তাঁর সামনে অথবা এখনো মার সামনে কেউ বলেতে পারে না। রানুদি আরেক দর্শনীয় ব্যক্তি। আমার চেয়ে মাত্র ে দেড় বছরের বড়। পাড়ার ছেলেরা তাকে দেখার জন্য প্রতিদিন আমারদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করে। ওরা জানে রানুদিও সমস্যা আছে তারপরও। আর রানুদি তো সকাল বিকাল রাত এই তিন বেলাই শুধু সাজে। রূপচর্চা করে। ভিসিডি দেখে। রানুদি মি. জেেনর বাড়িতে গিয়ে প্রায়ই ডিসে ছবি দেখে। মিন্টুকে অথবা আমাকে ভিসিডি ভাড়া করে আনতে বলে। তার আবদার রাখি। সবাই মিলে ভারতীয় বাংলা ছায়াছবি উপভোগ করি। এছাড়া রানুদির প্রিয় হিন্দি ছবি। বলা চলে হিন্দি ছবির পোকা। বাজার থেকে ভিসিডি আনলে সারাদিন হিন্দি ছবি দেখবে। হিন্দি ছবির নায়িকাদের মত তার ল্যাবণ্যময় রূপ। কে জানে সেই সব ল্যবণ্যময়ী নন্দিনীদের মত সে নিজেকে ভাবে কিনা। হয়ত ভাবে। তাই তো শরীরের প্রতি এতো যতœ। এতো সতর্ক। প্রতিদিন হালকা ব্যয়াম করে। পরিমিত খায়। তাকে দেখলে কেউ বুঝবে না সে অস্বাভাবিক বা মানসিক প্রতিবন্দী। এই পর্যন্ত তার অসংখ্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আমরা রাজি হইনি। যার সাথে তার বিয়ে হবে তাকে সে হয়ত পূণাঙ্গ সুখ দিতে পারবে না। বরং কষ্ট দিবে। নিজেও কষ্ট পাবে।
***
রুনুদির কয়েক দিন পর পরই শরীরে ত্যাজ আসে। সে কার সাথে যেন যুদ্ধ করে। তার সমস্ত শরীর কাঁপে। তখন খুব খারাপ গালি দেয় সেই অপশক্তিটাকে। আবার কখনো কখনো কি যেন বলে তা সে নিজেই জানে না। বাধা দিতে গেলে মারতে শুরু করে। সেই সময় এত শক্তি পায় যে কিছু ক্ষণের মধ্যে শান্ত হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সেই শক্তি তাকে ভড় করলে সে খুব হাসে। অন্যরকম হাসি। তার হাসির সুরটা কেমন মায়াময় মনে হয়। তাকে অনেক চিকিৎসা করোনো হয়েছে। কাজ হয়নি। পাবনা হেমায়েপুরে রাখা হয়েছে। সেখাসে রাখলে তার অবস্থা ভাল না হয়ে বরং আরো খারাপ হয়। আবার যখন সে সুস্থ হয়ে যায় তখন সেখানকার চিকিৎসকরাও আর সেখানে রাখাতে চান না।
বাবা-মার অত্যন্ত আদরের প্রথম কন্যা রানুদি। তারা সব সময় চাইতেন নিজেরাই সন্তানকে যেটুকু পারেন বুকে আগলে রাখতে। রানুদিকে নিয়ে বড় চিন্তা হয়।
একদিন ভর দুপুর বেলা দেখি সত্যি সত্যি রানুদির কি যেন হয়েছে। সে বলছে তার পেট ব্যথা। সে খুব কান্না করছে রানুদি কালো জাম (চম চম) খুব পছন্দ করে। সে আমাকে প্রতি হাটের দিনে কালো জাম আনতে বলতো। মাঝে মাঝে আনতাম। বাবা বেঁচে থাকাকালীন রানুদি কালো জাম আনতে বললেই বাবা আনতেন। আমরা ভেবেছি অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়াতে হয়ত পেট ব্যথা হয়েছে। পেটে কৃমি হয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে রানুদি বমি করে ঘর ভাসিয়ে ফেলেছে। মা তো খুব ভয় পেয়ে যান। আমি তেমন গুরুত্ব দেইনি। আমি আর রানুদি পিঠাপিঠি ভাইবোন। পিঠাপিঠি হওয়াতে আমরা সব সময় ঝগড়া লেগেই থাকতাম। আমি ওকে অনেক মেরেছি। সেও আমাকে অনেক মেরেছে। গালি দিয়েছি। শাসনও করেছি। কোন একটা কাজ না করলে হাতের কাছে যা পায় সেটা দিয়েই মারে। মারার পর অনুপ্ত হয়ে আবার আমার কাছে ফিরে আসে। জিজ্ঞেস করবে খুব লেগেছে
না লাগেনি।
দেখি কোথায় লেগেছে?
থাক দেখতে হবে না।
সে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি উচ্চ স্বরে বলি, বললাম তো লাগেনি। তুমি যাও। কিন্তু যে পর্যন্ত অভিমানী হয়ে থাকবো সে পর্যন্ত সে খাওয়া-দাওয়া কিছু করবে না। আমার কাছে বসে থাকবে। আমার পিছু পিছু ঘোরাফেরা করবে। আমি শুয়ে থাকলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে। তখন তার সাথে আর রাগ করে থাকা যায় না। তার আদরের স্পর্শ পেলে রাগ কোথায় যেন পানি হয়ে যায়।
শুক্রবার ও শনিবার দুলুদার ছুটির দিন। এই দুইদিন তিনি টিউশনি পড়ান না। শুধু বৃহস্পতিবার দিনে হাপ স্কুল হয়। তখন তিনি ক্লাশ নিতে যান। ছুটির দিনে দুলুদা বই পড়েন। তিনি মাঝে মাঝে বাজার থেকে নতুন বই কিনে আনেন। কখনো পরিচিত মানুষের মাধ্যমে ঢাকা থেকে বই আনান। রাত দুটা তিনটা পর্যন্ত বই পড়েন। স্কুলে যা পড়ান সেই বই তাকে কখনো পড়তে দেখি নি। তিনি সাহিত্য ছাড়াও জীবনী, ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে বই পড়েন। এছাড়া যত দৈনিক, মানিক, ত্রৈমাসিক, সাপ্তিাহিক পেপার পত্রিকা তো আছেই।
দুলুদা যেহেতু ভাল ছাত্র এবং ছাত্র পড়ান তাই মা দুলুদাকে বলেন, রানুকে খুব স্কুলে যেতে চায়। কিন্তু ওকে তো আর স্কুলে পাঠানো সম্ভব নয়। তাই যদি ওকে একটু পড়াতে।
দুলুদা বলেন, ঠিক আছে । রানুকে পড়াবো।
রানুদি অবশ্য অনেক আগে কয়েক বছর স্কুলে গিয়েছেল পরে আর আমরা পাঠাই নি। ও একটু পড়তেও পারে।
তাই নাকি?
হু।
ভাল তো। আজকেই সন্ধ্যায় রানুকে আমার ঘরে পাঠাবেন দুলুদা রানুদিকে অংক, বাংলা, ইংরেজী ইত্যাদি পড়ান। রানুদিও আগ্রহ নিয়ে পড়ে। ছোট মেয়েদের মত উচ্চ স্বরে পড়ে।
দুই এক এ দুই
দুই দ্বিগুণে চার
তিন দ্বিগুণে ছয়
আমার মা শুনে খুব খুশী হন। বলেন, ওরে দেখ আমার রানু মা কত পড়া শিখেছে। নামতা মুখস্ত বলছে। মা তারপর থেকে রানুদিকে আরো বেশি আদর যতœ নেওয়া শুরু করেছিলেন। তার ধারণা তার মেয়ে শিক্ষিত হলে সুস্থ হয়ে উঠবে। ছোট ছেলে-মেয়েদের বুদ্ধি বাড়ার জন্য মা-বাবা যেমন বেশি বেশি দুধ, ফলমূল খাওয়ান আমার মা-ও রানুদিকে দুধ, ডিম, মাছ মাংস বেশি করে খাওয়াতে লাগলেন।
***
কয়েক মাসের মধ্যে রানুদি বেশ কবিতা আবৃত্তি শিখে। সন্ধ্যায় যখন আমরা সবাই এক সাথে মালা প্রার্থনা করি, প্রার্থনা শেষে সে আমাদের আবৃত্তি করে শুনায়।
ভেবে ভেবে ব্যথা পাব মনে হবে
পৃথিবীর পথে যদি থাকিতাম বেঁচে
দেখিতাম সেই ল²ী পেঁচাটির মুখ
যারে কোনদিন ভাল করে দেখি নাই আমি এমন লাজুক পাখি
ধূসর ডানা কি তার কুয়াশার ঢেউয়ে ওঠে নাচে...
মুগ্ধ হয়ে আমরা সবাই রানুুদির আবৃত্তি শুনি। এক সাথে গল্প গোজব করি। রাতের ভাত খেয়ে টিভি দেখি। দুলুদা বেশি টিভি দেখে না। তিনি টিভি না দেখে বই নিয়ে বসে থাকেন আর আকাশ দেখেন। তার ঘরে রানুদিকে পড়ান। রানুদি দিন দিন বই পড়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এখন সারা দিন ঘরে বসে রানুদি বই পড়ে। আমাকে নতুন নতুন বই আনতে বলে। আমি কিনে আনি। এখন আর সে কালো জাম, চম চম খেতে চায় না। চায় শুধু বই। রানুদির দেখাদিখে সেতুও বইয়ের কীট হয়ে গেল। ইদানিং দু’বোন খুব বই পড়ে।
একদিন পত্রিকায় সেতুর কবিতা ছাপা হয়েছে। প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছে বলে সে যে কি খুব খুশি কিন্তু সে খুব লজ্জ্ব পাচ্ছে। আমি বললাম, দেখি পেপারটা আমার কবি বোনটা কি কবিতা লিখেছে।
যাও কবিতা না ছাই। তোমাকে দেখতে হবে না।
দে না একটু দেখি।
দেখতে হবে না। বেশি ভাল হয় নি। বলে লজ্জ্বায় লাল হয়ে যায়। আমি পত্রিকাটি হাতে নিলাম এবং আবৃত্তি করে সবাইকে শুনালাম। কয়েক দিন পর শুনলাম সেতু নাকি আরো অনেক গুলো কবিতা লিখেছে। রানুদি কবিতাগুলো আবৃত্তি করে সন্ধ্যায় প্রার্থনা শেষ। তখন গানেরও আসরও বসে। গান গায় মিন্টু। বাবার গানের খুব শখ ছিল। তাই তিনি অনেক কষ্ট করে হারমনিয়াম ও তবলা কিনে ছিলেন। সেই হারমনিয়াম এখনো আছে। মাঝে মাঝে রোজারি প্রার্থনার সময় মিন্টু বাজায়। এছাড়া ওর গানের গলা বেশ মিষ্টি। বাবার প্রিয় গানগুলো মিন্টু আমাদের গেয়ে শোনায়। মিন্টু যখন গান গায় তখন মা উঠে একটু দূরে গিয়ে বসেন। খুব মনোয়োগ সহকারে গান শোনেন। মিন্টুর গলার স্বর বাবার স্বরের মত সুরেলা। বাবাও গ্রামে আচার অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। বিশেষ করে লোক সংগীত। মিন্টু লোক সংগীত এমন সুন্দর করে গায় যে সেই গান শুনলে সত্যিই ভাললাগে। মনে হয় বাবাই বুঝি গাইছেন।
গান চলাকালীন সময় মার চোখ দিয়ে অশ্র“র ফোয়রা বের হয়। রানুদি বলে, মা তুমি কাঁদছ?
কই না তো। মা চোখ আড়াল করার চেষ্টা করেন।
***
ইন্টারমেডিয়েট পাশ করে মিন্টু বিএ. ভর্তি হয়। তার সেমিনারীতে (সেমিনারী অর্থ হলো খ্রিস্টান যুবকরা ফাদার হওয়ার আগে যেখানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়)
যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে গেল না। বাবা-মার ইচ্ছা আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে থেকে দু’ভাই বোন ঈশ্বরের দ্রাক্ষাক্ষেত্রে কাজ করি। শৈশবে মা-বাবা প্রায়ই এইসব কথা বলতেন। আমাদের ছোট কাকা ফাদার ও ছোট পিসি সিস্টার হয়েছেন। আমার এক পিসি ছিল। তিনি যুবতী বয়সেই মারা যান। আমার ঠাকুরদা নাকি খুব ইচ্ছা ছিল যেন তার দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে ফদার হয় এবং দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে সিস্টার হয়। ঠাকুরদার ইচ্ছা পূর্ণ হলো। কিন্তু ঠাকুমার আর ঠাকুরদার ভাগ্য বোধ হয় খারাপ। তাদের ছেলে-মেয়েরা ফাদার সিস্টার হওয়ার আগেই তারা সবাই মারা যান।
আমাদের বাবা-মার ইচ্ছাও ঠাকুরমা-ঠাকুরদার মতই। কিন্তু আমরা কেউ সেই পথে পা বাড়াই নি। আর সে পথে পা বাড়ানোর মত তেমন কোন ইচ্ছাও কারো মধ্যে দেখি নি। আমরা চার ভাই-বোনের মধ্যে দু’ভাই-বোন যদি সত্যি সত্যি ফাদার-সিস্টার হই তাহলে আমরা ফাদার-সিস্টার হওয়ার আগেই মা মার যান নাকি কে জানে। বাবা তো আমাদের ছেড়ে চলেই গেছেন।
****
আজকাল সূচনাকে নিয়ে মিন্টু খুব ঘোরাফেরা করে। সূচনা সেতুর সহপাঠি। এই বার একই সাথে ওরা দু’জনে এসএসসি পরীক্ষা পাস করেছে। মিন্টু প্রায়ই সূচনাদের বাড়িতে যায়। সূচনার বান্ধবী সেতু কিন্তু মিন্টু কেন যাবে সূচনাদের বাড়ীতে?
সূচনাও আসে আমাদের বাড়িতে। আমি ওকে ওদের বাড়িতে গিয়ে টিউশনি পড়াই। আমার কাছে কোন দরকারে খুব বেশি আসে না। তবে যখন আসে তখন সেতুর কাছেই আসে। ইদানিং সেতুর চেয়ে মিন্টুকেই সূচনার সাথে গল্প করতে দেখি। তারা খুব হাসাহাসি করে। সূচনা বাড়িতে এলে মিন্টু নিজের হাতে লেবু চা বানিয়ে খাওয়ায়। আমার সামনে পড়লে সূচনা খুব লজ্জা পায়। ওদের বাড়িতে অবশ্য পড়ার সময় কোন লজ্জা পায় না। সে আমার সাথে কথা বলে ভয়ে ভয়ে। ভয় না অন্য কারণে আমি যখন তাকে পড়া দেই তখন সে ল²ী মেয়ের মত পড়া প্রস্তুত করে দেয়।
সূচনারা তিন বোন। বড় বোন ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে স্বামীর সাথে আমেরিকায় চলে গেছে। সবার বড় এক মাত্র ভাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সবার ছোট বোন লিনা। ক্লাস এইটে পড়ে। ওদের দু’বোনকে পড়াই। লিনার মাথা খুব ভাল। সূচনাও পড়াশোনায় মোটামুটি। তাদের বাবাও আমেরিকায় থাকেন। তিনি চাচ্ছেন খুব তাড়াতাড়ি পরিবারের সবাইকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে।
আমাদের বাহিমালী গ্রামের একটা যুব উন্নয়ন ক্লাব আছে। গ্রামের সমস্ত যুবক-যুবতীরা এ ক্লাবের সদস্য-সদস্যা। ক্লাব থেকে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় প্রতিভার উন্মোষ। এক সপ্তাহ ধরে চলে এই অনুষ্ঠান। তখন মঞ্চ নাটকের আয়োজন করা হয়। মিন্টু প্রতিভা উন্মেষে গানে গত তিন বছর ধরে শেষ্ঠ গায়ক পুরস্কার পেয়ে আসছে। ওর গান শুনলে সত্যি ইর্ষা হয়। কোথা থেকে যে ও এমন প্রতিভা পেয়েছে? আবার গর্বও হয় যে ও আমার ছোট ভাই।
আমাদের ছোট পরিবার। অভাব অনটনের মধ্যেও কত আনন্দের জোয়ার বয়ে চলে সকলের মধ্যে। মিন্টুকে সেতু সূচনার নাম ধরে খেপায়। মা বা আমার সামনে সূচনার কথা বললে মিন্টু দারুণ খেপে যায়। তখন সেতু আর মিন্টুর ঝগড়া দেখতে বড় ভাল ভাগে। একদিন পাশের ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছি মিন্টু বলছে, দেখ সেতু যার তার সামনে সূচনা সূচনা বলবি না।
কেন বললে কি হয়?
তুই বলবি না।
একশ বার বলব।
তুই বলবি না খবরদার।
হাজার বার বলব।
বললে খবর আছে।
কি খবর, সকাল সাতটার খবর, নয়টার খবর- এ কথা বলে সেতু হাসতে লাগলো। সেতু আর মিন্টু তুমুল বাগ যুদ্ধ লেগে যায়। সেতু এমন এমন কথা বলে শোনলে না হেসে পারা যায় না। এক সময় মিন্টু ঝগড়া থামানোর জন্য সেতুকে ‘ঠাকুমা’ বলে। তখন সেতু দারুণ খেপে যায়। বাবা বেঁচে থাকতে প্রায়ই বলতেন আমাদের ঠাকুমা নাকি দেখতে সেতুর মত চেহারা ছিল। মুখটা গোলগাল। আর তিনি নাকি মানুষকে খুব হাসাতে পারতেন। আমাদের সেতু সহজে কথা বলে না কিন্তু কখনো কখনো এমন কথা বলে যে আশে পাশে যারা থাকে তারা সবাই হাসতে থাকে। আমাদের ঠাকুমাও নাকি এমন ছিলেন। তাই সেতুকে ঘায়েল করার দারুণ পয়েন্ট হলো তাকে ঠাকুমা বলে খেপানো। যেহেতু সেতু ঠাকুমা বললে খেপে।
ঠাকুমা বললে সেতুর মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। কথা বলে না। অভিমানী বোনকে যখনি মিন্টু একটু আদর করতে যায় তখনই সেতু ফিক করে হেসে দেয়। আবার দুই ভাইবোন এক সাথে লুডু খেলে। সেতুটা বড়ই চালাক। চুরি করে খেলতে পাওে। চার উঠলে গোনে পাঁচ ঘর। আর এক লাফে মইয়ে উঠে যায়। মিন্টু চালাকি ধরতে পারে না। বার বার সেতু মিন্টুকে হারায়। বড় ভাইকে হারিয়ে সেতু হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। মিন্টু হয়তো সেতুর চালাতি ধরতে পারে। কিন্তু সে কিছু বলে না। মিন্টু মানুষকে আনন্দ দিতে খুব পছন্দ করে। ওর বন্ধুরা বাড়িতে আসলে গানের আসর বসে। মিন্টু এমন এমন কথা বলে যে ওর বন্ধুরা খুব হাসে। সেতু ও মিন্টুর বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে এসেই যুব উন্নয়ন ক্লাবের অনুষ্ঠানের জন্য গান চর্চা করে। সূচনাও আসে। আগামী ডিসেম্বরে বড়দিনের পর পরই হবে প্রতিভার উন্মেষ। তখন মিন্টু ও সূচনা যৌথ কণ্ঠে একটি গান গাইবে তাই এক সঙ্গে গান প্যাকটিস করে। যখন তারা দু’জনে গান গায় তখন খুব ভাল লাগে। কি যেন মায়া আছে ওদের দু’জনের কণ্ঠে।
২৭ ডিসেম্বর। যুব উন্নয়ন ক্লাবের আয়োজিত সপ্তাহ ব্যাপি সংস্কৃতি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান পরিচালনায় সহায়তা করছেন গ্রামের সমস্ত অভিভাবক এবং শিক্ষক-শিক্ষকাগণ। এতে অংশগ্রহণ করে শিশু ও যুবক-যুবতিরা। সার্বজনীনভাবেও একটা বিষয় থাকে। সেখানে সব বয়সের লোক অংশগ্রহণ করতে পারবে। এবারও প্রতিভার উন্মেষে মিন্টু গানে চ্যাম্পিয়ন হলো। কয়েকজন অভিভবক ওকে ধরলো মিন্টুকে তাদের সন্তারদের গান শেখানোর জন্য। মিন্টু পড়াশোনার পাশাপাশি গানের মাস্টার হয়ে গেল।
***
মিন্টু গানের মাস্টার হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে লাগলো গ্রামে। কলেজে বন্ধু মহলে এবং আমাদের পরিবারেও খুব জনপ্রিয়তা মিন্টুর। আমরা বাড়িতে বা বাইরে সারাদিন ব্যস্ত থাকি। সন্ধ্যায় প্রার্থনা শেষে মিন্টুর গানে ডুবে যাই। রাতের নেশা লাগা হাসনা হেনার সুরভি ভেসে আসে চাঁদেও জোছনার সাথে মিশে। এমন পরিবেশে আমরা সবাই নীরবে মিন্টুর গানে হারিয়ে যাই। মিন্টু প্রতি রোববার গির্জায় খ্রিস্টযাগের সময় গান চালায়। ইটালিয়ান ফাদার দীনো তার গানের খুব প্রশংসা করেন।
কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি একট লম্বা মতন ছেলে আমাদের বাড়ির কাছ দিয়ে ঘুর ঘুর করছে। দিনে অন্তত সাত আটবার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে দেখা যায়। বাড়ির সামনেই রাস্তা। রাস্তা থেকে বারান্দার মানুষ দেখা যায়।
একদিন রানুদির কাছ থেকে একটা কালো মতন ছেলে এসে বলে পানি খাবো। রানুদি আগন্তককে কাচের গ্লাসে পানি এনে এগিয়ে দিল। আগন্তুক পানি খাওয়া বাদ দিয়ে রানুুদির দিকেই চেয়ে রইল।
এ ঘটনায় মা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। সিয়ানা সিয়ানা দুটা মেয়ে। রাস্তার ধারে ভালভাবে বেড়া দেওয়া উচিত। বাঁশের চাটাই দিয়ে উঁচু করে বেড়া দেয় হলো। ছোট একটা গেট তৈরী করা হলো যেন যে কেউ এসে হুট করে বাড়িতে ঢুকতে না পারে। কিন্তু রানুদিকে আটকানো বড় মুসকিল। ছোট বেলা থেকেই তার ছোটা ছুটি করার অভ্যাস। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি। প্রতিবেশীরা সবাই রানুদিকে স্নেহ করে, ভালবাসে। তার সমবয়সী মেয়েরা প্রায় সবাই বিয়ে হয়ে গেছে। রানুদি তার বান্ধবীদের বাড়িতে যায়। বান্ধবীদের বাচ্চা কোলে নেয়। আদর করে। মাকে এসে একদিন সে জিজ্ঞেস করে, মা আমার কবে বিয়ে হবে?
হবে মা হবে। আগে তুমি সুস্থ হয়ে উঠ তারপর তোমার বিয়ে হবে। তোমার জন্য রাজপুত্র একটা বর আনবো। কবে আনবে মা? মা আমি তো বুড়ি হয়ে যাচ্ছি। আমার মাথায় একটা শ্বেত চুল। একথা বলে রানুদি তার মাথার পাকা চুলটি দেখায়। মা বলেন, ও কিছু না মা। সবার মাথাই দু’এতট শ্বেত চুল থাকে।
***
জৈষ্ঠের কাঁঠাল পাকা গরম। গ্রামে প্রায়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। এত গরমে রানুদির মাথা বিগড়ে যায়। সেদিন সারাদিন বেশ শান্ত ছিল। মা ঝড়াগোপালপুর মামার বাড়ির গেছেন। সন্ধ্যা রোজারি প্রার্থনা শেষ করে সবাই উঠানে বসে গল্প করছি। রাত প্রায় দশটা বাজে। অন্যদিন বিদ্যুৎ আসলে ভাত খাব। রানুদি সেদিন প্রার্থনা করেনি। তার নাকি ভাললাগছিল না। তাই সে মার ঘরে শুয়ে ছিল। রাতে আমরা ঘরে ভাত খাই। কুপিবাতি হাতে নিয়ে মার ঘরে প্রবেশ করলাম। সাথে সাথে বিদ্যুৎ চলে এলো। কিন্তু রানুদিকে দেখে চমকে উঠলাম। তার গায়ে কোন বস্ত্র নেই। স্বর্গেও দূতের মত দাঁড়িয়ে । আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। আড়াল থেকে বললাম, কাপড় পর।
সে নীরব।
কি ব্যাপার। পরছ না কেন? সে আবারও নীরব।
কথা বলছ না কেন? কি হলো?
সে তবুও নীরব।
এরকম করা খুব খারাপ। মা মামা বাড়ি থেকে আসলে তাকে বলে দিলে সে তোমাকে মারবে।
আমি ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। কিছুক্ষণ পর কাপড় পওে রানুদি সেতুকে ডাকলো। তার নাকি খুব খিদে পেয়েছে। ভাত বেরে দিতে বলছে।
রানুদির ঘটনাটির জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। সেদিন আর টিভি দেখলাম না। খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। মিন্টু আর সেতু ভিসিডি দেখছিল। রাত তিনটা পর্যন্ত ভিসিডি দেখে যার যার ঘরে শোতে গেল। রাত চারটার দিকে হঠাৎ দরজার শব্দ হতে লাগলো। লাফিয়ে উঠলাম। সেতু বলেছে, বড়দা উঠ রানুদি কেমন জানি করছে। খুব বমি পাড়ছে। জ্বরও এসেছে। তার জন্য ঔষধ লাগবে। লাইট অন করলাম। আগে সেতুকে দরজা খুলে ঘরে প্রবেশের সুযোগ দিলাম। বললো, তাড়াতাড়ি একটা ঔষধ দাও। রানুদির খুব জ্বর। জ্বরে কেমন জানি করছে। বমি করে ঘর ভাসিয়েছে। এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা। আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে কিছু না কিছু ঔষধ থাকে। খোঁজে বের করলাম। বমির জন্য এবোমিন ও জ্বরের জন্য নাপা নিলাম কয়েকটা। সেগুলো সেতুর হাতে দিলাম। বললাম, কিছু খাওয়ানোর পর ঔষধগুলো খাওয়াতে। খালি পেটে খাওয়ানোর দরকার নাই। সেতু বললো, ঘরে বিস্কুট আছে।
রানুদি ঘরে গিয়ে দেখি সত্যি তার অবস্থা খুব খারপ। সারা শরীর আগুনের মত গরম। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। এদিকে বমির গন্ধে আমার দম আটকে আসছিল। সেতু রানুদির চোখ মুখ ধোয়ালো। শেলফ থেকে বিস্কুট বের করলাম। অনেক কষ্টে একটা বিস্কুট খাইয়ে দিলাম। রানুুদির অসুখ হলে সে একেবারে বাচ্চা মানুষের মত হয়ে যায়। সব কিছু করে দিতে হয়। এই সময় মা থাকলে রানুিুদর অবস্থা দেখলে সত্যিই কেঁদে ফেলতেন। এই রাতেই ডাক্তার ডাকতে পাঠাতেন। ঘরে ঔষধ থাকাতে আর ডাক্তারের কাছে গেলাম না। সেতু ল²ী মেয়ের মত বমি পরিষ্কার করলো। ঠাণ্ডা পানিতে রুমাল ভিজিয়ে উত্তাপ কমানোর জন্য রানুদির মাথায় জলপট্টি দিলাম। সেতু সারা রাত ঘুমায়নি। এখন মুখে তার চোখ জমাট হয়ে গেছে। বাইরে দু’একটা পাখির কলরব শোনা যায়। মসজিদ থেকে আযানের সুর ভেসে আসে। বুঝতে পারলাম ভোর হয়ে এসেছে। রানুদির পাশে শুয়ে সেতু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। রানুদিও গভীর তন্দ্রা দেশে হারিয়ে গেছে। ভোরে সূর্যোদয় দেখা হয় না অনেক দিন। উঠানে গিয়ে হাসনাহেনা গাছের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভোরের নতুন পৃথিবী সত্যিই অন্যরকম মনে হয়। অন্ধকার আকাশের পূর্ব দিকে সূর্যের রক্তিম আভা দেখা যাচ্ছে। বড় ভাল লাগছিল অন্ধকারে আলোর দেখা দেখতে। আমাদের ছোট এ পরিবারের সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। অন্ধকার থেকে বাবার মত কে যেন ডাকছে। এ কুয়াশাময় সকালে বাতাসে মিশে আমার কানে কানে বলে দিচ্ছে, তোমাদের পরিবারের আলো জ্বালাও বড় ভালো লাগবে।
ভোরে চা নাস্তা খাওয়ার পর রোজ পত্রিকায় চোখ বুলাই। দৈনিক উত্তরবার্তায় উত্তর সাহিত্য বিভাগ সপ্তাহে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। উত্তর সাহিত্যে চোখ পড়তেই সেতুর নাম চোখে পড়লো। সেতুর কবিতার নাম গভীর রাত।
সন্ধ্যা থেকে শুরু করে শেষ রাত পর্যন্ত বর্ণনা কবিতাটিতে। সন্ধ্যায় উঠানে সমবেত প্রার্থনার আসর। হাসনাহেনা, বাদুরের ডানা ঝাপটার শব্দ। জোছনার ফোয়ারা জোনাকির মেলা। নিঃস্তব্ধ রাতের বিষণœতা, নীরব কুয়াশার হৃদয় স্পর্শ, গির্জার ঘন্টার শব্দ, মসজিদের আযানের ধ্বনি সবই কবিতার অবয়বে আছে। কবিতার শেষে আছে-
অন্ধকারে সব আলোক করে
ভেসে উঠে প্রিয়ার সূর্যমুখী মুখ।
এই দুই পংত্তির জন্যই হয়ত সেতু আমার কাছে ভিরছে না। আমাকে পত্রিকা হাতে নিতে দেখে সে ঐ ঘরে চলে গেছে। আমি রানুদিকে নিয়ে কবিতাটি দেখালাম। সে আগের চেয়ে এখন একটু সুস্থ। সে বললো, সেতুকে ডাক। ও আবৃত্তি করে শোনাক। সেতুকে ডাকলাম। প্রথমে তো সেতু আসতেই চায় নি। জোর করে ধরে নিয়ে আনলাম। দেখি লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে আছে। আবৃত্তি করলো খুব কষ্টে। যারা কবিতা লেখে তাদের সবাই ভাল আবৃত্তি করতে পারে না। সেতু না পারার দলে। মিন্টু ও রানুদি কবিতা না লেখলেও ভাল আবৃত্তি করতে পারে।
কবিতাটি আবৃত্তি করার সময় সেতু লাল হয়ে গেল। আবৃত্তি শেষে তাকে ধন্যবাদ জানানো হলো। পত্রিকায় শুন্য দশকের কবিদের নিয়ে একটা মতামত লেখা হয়েছে। সেতুর কথাও মতামতে উলেখ আছে। বগুড়া কলেজের একজন বাংলার অধ্যাপক সেতুর কবিতা প্রশংসা করেছেন। কিভাবে লিখলে সেতু আরো ভালো করতে পারবে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রশংসায় সেতুর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিজেকে গর্বিত মনে হলো। নিজে কিছু লিখতে না পারলেও বোন তো লিখিতে পারে! সে একদিন অনেক বড় হবে। বড় লেখকদের মধ্যে একজন থাকবে।
বাড়িতে সবাই সেতুকে লেখা-লেখির জন্য অনুপ্রেরণা, উৎসাহ দেই। কবি বোন বলে ডাকি। কবি কথাটি শুনার পর তার মুখে দীপ্তির আভা দেখতে পাই। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা অফিসে সেতুর কবিতা পৌঁছে দেই। কবিতা ছাপা হয়। অনেকে নাকি মিন্টুকে জিজ্ঞেস করেছে, সেতু কি তোমার বোন। মিন্টু বড় গলায় বলে হ্যাঁ আমার ছোটা বোন। বাড়িতে এসে মিন্টু আমাদের এসব কথা বলে।
একদিন দেখি সেতুর কবিতার বই বের হয়েছে। মিন্টু আর সেতু কাউকে না জানিয়ে প্রকাশকদের সাথে যোগাযোগ করে এই কাজটি করেছে। বইয়ের নাম নিঃসঙ্গ রাত। বই নিয়ে বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেছে। নতুন বই দেখে দুলুদা দুই কেজি নাটোর থেকে কাচা গোলা নিয়ে আসলো। আমাদের বাহিমালী গ্রাম থেকে ২০ কি.মি দূরে নাটোর শহর। দুলুদার ধারণা সেতুর কবি হওয়ার পিছনে তার অবদান সব চেয়ে বেশি। তার দেখা-দেখি সেতু ও রানুদি বই পত্র পড়ে। এখন সেতুর ছাই চাপা প্রতিভা প্রকাশিত হচ্ছে। এটাই তার আনন্দ। দুলুদার স্কুলেও বেশ কয়েক কপি বই নিয়ে গেলেন। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ সেতুর প্রতিভার চমক দেখে হতবাক। সেতুকে অভিনন্দন জানানোর জন্য প্রধান শিক্ষক বাড়িতে আসেন। তিনি সেতুকে প্রেরণা দেন। লেখা-লেখি বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের সাথে তার অনেক ক্ষণ আলাপ হয়।
আমাদের একমাত্র মামা যোহন রোজারিও ঢাকা থেকে যখন শোনলেন যে সেতু কবিতার বই বের হয়েছে তিনি তো মহা খুশি। তিনি সেতুকে আরো বড় সাহিত্যিক বানানোর জন্য বেশ কিছু বড় বড় লেখকের বই পাঠালেন। চিঠিতে লেখলেন সেতু যেন লেখা পড়ার পাশাপাশি আরো লেখা-লেখি করে। সেতু ঢাকায় মামাকে একটা কবিতার বই পাঠালো।
একমাস পর মামা বাড়িতে এসে তো খুব খেপা সেতুর উপর। গাধা, নিলজ্জ্ব বলে গালি দিতে লাগলেন। দু’গালে দু’টা চড় কষে দিলেন। বললেন, সেতু যেন আর কবিতা না লেখে। সেতুর অপরাধ সে বইটা একটা ছেলের নামে উৎসর্গ করেছে। ছেলেটারর সম্পর্কে বাড়ির কেউ কিছু জানে না। বাবা-মাকে রেখে কবিতার বইটি অন্য ছেলের নামে উৎসর্গ করাটাই সেতুর অপরাধ। সেতু চোখ মুছতে মুছতে নিঃশব্দে আমাদের সামনে থেকে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে একা একা সারা দিন বসে রইল। সেতুর বইটা উৎসর্গের ব্যাপারে দু’একজন কিছু কিছু কথা বললেও মামা যেন সবার পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিলেন। কিন্তু মামার এত নিষ্ঠুর হওয়াটা আমাদের কারোরই পছন্দ হলো না।
মামার খুব ইচ্ছা ছিল সেতু সিস্টার হবে। অনেক দিন মামার এ আশা বুকে লালন করে আসছেন। কিন্তু যখনই কবিতা বইটা থেকে প্রেমের কবিতা পড়লেন তখনই তার মাথা খারাপ হয়ে গেল। তাও বইটা উৎর্স নিজ আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে নয়। এক ভিন্ন ধর্মের ছেলে বন্ধু। যা সিস্টার না হওয়ার পূর্ব লক্ষণ। প্রথমে মামা কবিতা বইটা প্রকাশের কথা শুনে খুব আনন্দিত হলেও পরে খুব কষ্ট পান। সেতুর দিকে তীক্ষè শাসনের দৃষ্টিতে তাকান। সেতুরও যেন আর মামাকে সহ্য হয় না।
সেতু এখন মন মরা হয়ে বসে থাকে। কবিতা লেখে না। সন্ধ্যায় আর আবৃত্তি হয় না। অনেক বলে কয়ে আমি আর রানুদি সেতুকে কবিতা লেখায় রাজি করালাম। এখন সে লেখে কিন্তু আবৃত্তি করার সময় উপস্থিত থাকে না। এখন তার কবিতার বিষয় প্রেম-বিরহ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তার কবিতায় দু’একটা পংত্তি হৃদয় স্পর্শ করে। তখন মনে হয় ঈশ্বর যাকে যে গুণ দিয়েছেন তা সে প্রকাশ করুক।
***
একদিন সকালে পিয়ন একটা পেকেট দিয়ে গেল সেতুর নামে। সেতু ও রানুদি পেকেটটা খুলল। সাপের মত ছয় সাত হাত লম্বা এবটা কাগজ বের হলো। একটা পত্র। ঘর বন্ধ করে সেতু ও রানুদি পত্রটি পড়ল। রানুদি বললো, আমি বলে দিবো চিঠিতে কি লেখেছে। সেতু রানুদিকে বার বার অনুরোধ খরছে বলতে না। মা মনে হয় বুঝতে পেরেছেন। তিনি ছোট মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, কে চিঠি দিলো রে?
কেউ না।
কেউ না মানে?
ভুয়া চিঠি, কেউ দুষ্টামি করে দিয়েছে।
চিঠিটা দেখা।
দেখানো যাবে না মা।
চিঠিটা আামাদের কাউকে দেখানো হল না। সন্ধ্যায় চা খাওয়ার সময় মা জিজ্ঞেস করলাম, পত্র লেখকটা কে? জানতে পারি?
না।
কেন?
মাকে বলিনি, আর তোমাকে বলব।
দূর বোকা সবাইকে কি আর সব কথা বলা যায়। মাকে যা বলতে পারিস নি তা আমাকে বলতে পারিস। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সেতু বললো, ঐ ছেলেটা।
কোন ছেলেটা।
মিন্টু তখনই বলে ফেললো তোর কবিতা বই যাকে উৎসর্গ করেছিস সে। সেতু মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। এবার পরিষ্কার হল সেই ছেলেটি যাকে সেতু বই উৎসর্গ করল।
মা আমাদেরকে কোন সময়ই এতবেশি শাসন করেন না। বাবাও করতেন না। আমাদের সব সময় স্বাধীনতা দিতেন। ছোট বেলায় খুব দুষ্ট ছিলাম। একবার সকালে মরবেল খেলতে গিয়ে বিকেলে এসেছি। না খেয়ে রোদে মারবেল খেলেছি। মা রাগে কাঁচা পাটকাঠি আমার পিঠে ফাটিয়েছিলেন। সেদিনই শিক্ষা পেয়ে আর কোন দিন মা-বাবার অবাধ্য হই নি। সেই ঘটনার পর থেকে কোনদিন বই পড়তে বসতে বলতেন না। আমি নিজে থেকেই পড়তে বসতাম। ছাত্র হিসাবে আমারা ভাই-বোনেরা ভাল। তাই বাবা-মা আমাদের শাসনও কম করেন।
বিকালে একটা ছেলে বাড়ির সামনে দিয়ে বার বার হাঁটাহাটি করছে। হাতে সিগারেট। কলেজ পড়ুয়া যুবক। আগে কোথায় জানি দেখেছি। ও মনে পড়েছে। বনপাড়া কলেজের সামনে বাড়ি। নাম তুহিন। ছেলেটার কলেজে পড়ার পাশাপাশি কসমেটিকের দোকান চালায়। মা বাড়িতে নেই। আমাদেও গ্রামের মাসির বাড়িতে গিয়েছে। রানুদিও মার সাথে গিয়েছে। দুলুদা তখনও স্কুলে থেকে ফেরেনি। আর মিন্টু তো বিকাল হলেই বন্ধুদেও সাতে ক্লাবে বা বাজাওে আড্ডা মারতে যায়। আমি ঘরে বসে আছি। সেতু হাতে করে কি যেন নিয়ে গেল তুহিনের কাছে রাস্তায়। জিনিসটা দিয়ে দ্রুত ফেরত আসলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ তাকে দেখেছে কিনা। ছোট নিঃশ্বাস ফেললাম।
পরদিন বিকালে বাজারে গেলাম। আমজাদ স্যারের সাথে দেখা। তিনি বাংলার খুব ভালা লেকচারার। সেতু কবিতা লেখে তাই স্যারের সাথে ওর ভাল জানাশোনা। স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সেতুর কি হয়েছে। কয়দিন ধরে সে কলেজে আসছে না কেন?
কই কিছু হয়নি তো স্যার।
তিনদিন ধরে কলেজে আসছে না।
ও মা মামার বাড়িতে গিয়েছে। তাই কলেজে যায়নি।
আগামী কাল দেখা করতে বলো।
ঠিক আছে স্যার।
স্যারকে বললাম না যে মা মাত্র একদিন মামার বাড়িতে থেকে চলে এসেছে। এছাড়া সেতু দু’দিন কলেজের ইউনিফলম পরে বের হয়েছে। কলেজে না গিয়ে সেতু কোথায় গিয়েছিল? মনে মনে বললাম, আর সহ্য করা যায় না। আজই জিজ্ঞেস করতে হবে কলেজের নাম করে কোথায় যায়, কি করে। আমার মাথায় সত্যি সত্যি এবার দুচিন্তা নামক ভাইরাস প্রবেশ করল।
সন্ধ্যায় চা খাওয়ার পর বললাম, সেতু তোর সাথে আমার কথা আছে।
কি কথা?
জরুরী কথা।
বল।
এখন বলা যাবে না। রাতে খাবার পর আমার ঘরে আসবি।
না জরুরি কথা এখনি বল।
বললাম তো এখন বলা যাবে না।
খেয়াল করলাম সেতু একটু নার্ভাস হয়ে যাচ্ছে। সে এখনি বলার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো। বললাম, এখন বলার মত পরিবেশ এবং মেজাজ নেই বরং রাতেই শুনিস।
সেতু রাতে সেতু ভাত খায় নি। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে সে নাকি মোটা হয়ে যাচ্ছে। খাওয়া দাওয়া কমাতে চায়। ওর স্বাস্থ্য মোটামুটি ভাল। চিকন না হলেও চলে। তবু সে চিকন হতে চায়। ভাত খাওয়ার জন্য মা ডাকলেন। সে আসলো না। রানুদিকে দিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে আসল। সে বললো, তুমি না খেলে আমিও কিছু খাব না। রানুদি সবাইকে তুমি বলে ডাকে। সেতু উপায় না দেখে একটা ডিম খেল। ডিমটা খেতে ও যেন লজ্জা পাচ্ছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে পড়ল।
রাতে সবাই টিভি দেখছে। সেতু আমার কাছে এলো। নিঃশেব্দে টিবিলের পাশে বিছানায় বসলো। আমার জানালার পাশে একটা ঝাপড়ানো কামিনী ফুলের গাছ আছে। গাছটায় রাতে ফুল ফুটে অন্ধকারে শ্বেত হয়ে আছে। আকাশের চাঁদের জোছনা গলে গলে আমার খোলা জানালা দিয়ে প্রবেশ করছে। প্রকৃতি এত সুন্দর পরিবেশ করে দিয়েছে কিন্তু এই সুন্দর মুহুর্তে কি কেউ সবার ছোট আদরের বোনকে জেরা করতে পারে? কেউ কি বলতে পারে কেন একটা যুবক ছেলে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে? কেন তুমি কলেজে না গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাও?
কিছু বলার আগেই সেতু বললো, দাদা আমি জানি তুমি কিসের জন্য আমাকে ডেকেছ।
তুই জানিস?
হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। সেতুও চুপ করে বসে রইল। ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে বলি বসে আছস কেন চলে যা, গিযে টিভি দেখ। বাস্তবে তা বলতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটা কে?
তুহিন।
চিঠিটা কি তুহিনই দিয়েছিল?
হ্যাঁ। তুহিন আমার খুব ভাল বন্ধু।
জানি, বন্ধু থাকা ভাল।
বড়দা তুমি কি আরো কিছু জানতে চাও?
না মানে আজ বাজারে চায়ের দোকানে তোর প্রিয় আমজাদ স্যার তোর খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। জিজ্ঞেসা করেছিলেন তোর কিছু হয়েছে কিনা। তুই নাকি দু’দিন ধরে কলেজে যাস না।
হু।
কোথায় গিয়েছিলি?
একদিন গেলাম বগুড়ায় করতোয়া পত্রিকা অফিসে আর অন্য দিন নীলাদের বাড়িতে। সাথে অবশ্য তুহিন ছিল। নীলার খুব অসুখ করেছে।
নীলাও আমাদের খুব ভাল বান্ধবী।
তাই নাকী?
হু।
তুহিনকে একদিন আমার সাথে দেখা করতে বলবি। তার সাথে কথা বলব।
ঠিক আছে।
দেখলাম ছেলেটা খুব সিগারেট টানছে। এতো সিগারেট খাওয়া ভাল না। কম সিগারেট টানতে বলিস। সেতু কিছু বললো না। সে ভয়ে ভয়ে বললো, দাদা ওকে আমি ১ হাজার টাকা ধার দিয়েছি। আমার কাছে জমানো ছিল সেখান থেকে।
কেন?
ওর মা নাকি খুব অসুস্থ।
ও ঠিক আছে। বন্ধুর বিপদের দিনে বন্ধুই তো সাহায্য করে। তবে সাবধান আমি যেন কোন রকম কথা না শুনি। যথেষ্ট বড় হয়েছিস। তোকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। অনেক আশা। তাই সাবধানে চিন্তা ভাবনা করে যা করার করবি।
ঠিক আছে। আমি যা করবো। তোমাকে সব বলবো।
সব বলতে হবে না। যেগুলো বলার মত সেগুলো বললেই হবে। বলেই হেসে দিলাম। সেতুও হাসতে হাসতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আমার এই বোনটি এতো ভাল এবং এতো আদরের যে এর কোন দোষই খুঁজে পাওয়া যায় না। ওকে শাসন করতে চাইলেও শাসন করতে পারি না। পৃথিবীতে সব সময়ই দু’একজন মানুষ থাকে যাদের শাসন করা অন্যায় মনে হয়।
বাবা গৃহস্তালি করে সংসার চালাতেন। জমি-জমা বাড়ি ভিটা বাদ দিয়ে তিন বিঘা। কিছু গবাদি পশুও আছে। আমার মা আমাদের চার ভাই-বোনকে রেখে বাবা চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। জমিতে যেটুকু ফসল হয় তা দিয়ে নিজেদের সারা বছর চলে। কিন্তু আমাদের পড়াশুনার খরচ বহন করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা তিনভাই বোনই এখন টিউশনি করি। মা সংসারের হাল ধরার জন্য গাছের ফলমূল, গাভির দুধ, হাস-মুরগির ডিম ইত্যাদি বিক্রি করে টাকা জমা করেন। মার কষ্ট দেখলে আমার আকাশ কালো হয়ে যায়। মাঝে মাঝে চারদিক অন্ধকার দেখি। দুলুদা আছে বলেই রক্ষা। তিনি মাসে তিন হাজার টাকা খরচ করেন। আবার রানুদি, মাকে ও সেতুকে কাপড় কিনে দেন। এছাড়া তার গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠান। মা প্রায়ই বলেন, দুলু না থাকলে আমাদের যে কি অবস্থা হতো? দুলুদা আমাদের পরিবারের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছেন যে কেউ আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে মনে করে তিনি আমাদের বড় ভাই। দূর দূরান্ত থেকে ভিক্ষুকরা ভিক্ষা নিতে আসলে মাকে বলে আপনার বড় ছেলেকে এখনো বিয়ে করাচ্ছেন না কেন? মা তখন বলেন, দুলু তার ছেলের মত কিন্তু পেটের ছেলে না। বড় ছেলে হচ্ছে আরেকজন।
পরিবারের সবায় ভাই দুলুদাকে শ্রদ্ধা কওে ও ভালবাসে। মা দুলুদাকে এতো স্নেহ করেন যে তা দেখে ইর্ষা হয়। গাছ থেকে আম পাড়লে দুলুদাকে বড় আমটা দিয়ে দিবেন। বাড়িতে ভাল রান্না হলে মা দুলুদাকে বেশি দেয় এবং ভালাভাবে খাওয়ান। এজন্য অবশ্য আমাদের কারোই কোন আপত্তি নেই। তিনি মাস্টার মানুষ। অংকের জাহাজ। বেশ গুছিয়ে কথা বলেন। তিনি বাড়িতে থাকতে মাঝে মধ্যে অন্য শিক্ষকগণ আমাদের বাড়িতে আসেন। এছাড়া আমাদের গ্রামের সবাই তাকে সমীহ করে। বিচার শালিশে তাকে ডাকা হয়।
মি. জন আমাদের গ্রামের সব চেয়ে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। দুলুদা আমাদের বাড়িতে এসে অল্প কিছুদিনের মধ্যে মি. জনের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেন। ঐ বাড়িতে সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়। দুলুদা না গেলে তার জন্য খাওয়া চলে আসে। মিষ্টি, মাছ, মাস, পোলাং, ফল কত কিছু!
***
একদিন রানুুুুুুুুদি মাকে জিজ্ঞেস করল মা আমাদের জন্ম দিন নাই?
আছে মা থাকবে না কেন?
কবে মা?
তোমার ২২ শে ভাদ্র।
আমার জন্মদিন পালন কর না কেন?
আমরা তো মা কারো জন্ম দিনই পালন করি না। শুধু ২৫ শে ডিসেম্বর যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন পালন করি।
এবার থেকে আমাদেরর জন্ম দিন পালন করতে হবে।
ঠিক আছে পালন করবো।
আমরা নিজেদের জন্ম দিনের কথা কখনই মনে করতাম না। সংসার নিয়েই টানাটানি আবার জন্মদিন। রানুদি জন্মদিন পালন করার কথা বলার পর প্রথমে সেতুর জন্মদিন আসলো। মা ঘোষণা দিলে সন্ধ্যায় জন্মদিনের উৎসব করা হবে। মা একটা দেশি মোড়ক কাটলেন। আতপ চালের পায়েস রান্না করলেন। মিন্টুকে দিয়ে নাটোর সদর থেকে কাঁচাগোলা আনা হলো। মা রান্না শেষ করে আমাদের সঙ্গে বসলেন। সন্ধ্যায় এক সাথে মালা প্রার্থনা করলাম। দুলুদা সচরাচর সন্ধ্যায় বাড়িতে থাকেন না কিন্তু সেতুর জন্মদিন দেখে বাড়িতে থাকলেন। প্রার্থনার শুরুতে সেতুর মঙ্গলের জন্য মা-মারীয়ার কাছে প্রার্থনা করা হলো।
প্রার্থনা শেষ করে সবাই খাবার ঘরে গেলাম মার হাতে বানানো কেক সেতু কাটলো। সাবাই জন্মদিনের গান গাইলাম। সেতু খুব খুশি। মা সেতুকে একটা ঝিনুকের মালা পরিয়ে দিলেন। আর দুলুদা তার জন্য আকাশি রংয়ের একটা শাড়ি কিনে উপহার দিলেন। এই মুহুর্তে একটা আবৃত্তি আর গানের আসর বসলে মন্দ হত না। আমার মনের কথাটি রানদি বলে ফেললো।
সে বললো, মিন্টু ভাই একটা গান গাও না?
সাথে সাথে সেতুও মিন্টুকে গান গাইবার জন্য আবদার করল।
মিন্টু বলেলো, গান গাইবো একটা শর্তে । তুই যদি দুলুদার দেওয়া নতুন শাড়ি পরে আসিস। সেতু প্রথমে আপত্তি করলো। পরে অন্য সবার জোরাজুরিতে শাড়িটা পরল। মিন্টু আর দুুলুদা হারমনি ও তবলা নিয়ে বসলো। আমরা সবাই তাদের কাছে গিয়ে বসলাম। মিন্টু একটা দুইটা করে আটটা গান গাইলো। এত সুন্দর গান ও সুর যে আমরা তন্বয় হয়ে শুনলাম। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলাম। তিনি এমন গায়ক ভাইকে আমাদের দিয়েছেন। যার গান-সুর আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। দুলুদা খুব ভাল তবলা বাদক। আমাদের বাড়িতে বিনোদনের জনপ্রিয় মাধ্যম হলো এই গান বাজনা। গান শেষে সেতু নিজের হাতে চা বানিয়ে খাওয়ালো। মিন্টুর জন্য আলাদা লেবু চা। সে লেবু চা ব্যতিত অন্য চা একদম খেতে চায় না। আর লেবু চা তার খুব প্রিয়। চায়ের আসরে রানুদি আবৃত্তি শুরু করলো। আমরা উপভোগ করলাম। পরিশেষে সেতু ধন্যবাদ জানালো তার জন্য এতো সব করার জন্য। তারপর এক সঙ্গে সবাই খাবার খেলাম। মার নাকি খুব ক্লান্ত লাগছিল। তাই তিনি ভাত খেয়ে শুতে চলে গেলেন। দুলুদা তার ঘরে চলে গেলেন বই পড়ার জন্য। বাকি রইলাম আমরা চার ভাই-বোন। মিন্টু বিকেলে ভিসিডি ভাড়া করে এনেছিল। এখন সারা রাত সিনেমা দেখা হবে।
রাত প্রায় এগারটা বাজে। বাইরে আামাদের কুকুরটা খুব ডাকাডাকি করছে। মিন্টু লাইট নিয়ে বাইরে গিয়ে দেখে আসলো। কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর আবার কুকুরের ছুটাছুটির শব্দ পাওয়া গেল। আমি উঠানে গিয়ে দেখে আসলাম। কেউ এসেছে কিনা। কয়েকদিন ধরে চোরের খুব উপদ্রব। তিনদিন আগে পাশের বাড়ি থেকে ৬০ পাওয়ারের ফুজি বাল্বটাও চুরি হয়ে গেছে। আর আজকালকার চোরের খুব বুদ্ধি। আগে বাল্ব চুরি করে তারপর অন্য জিনিস।
বাইরে থেকে এসে হিন্দি ছবি দেখছিলাম। আবার কুকুরের শব্দ হলো। আমি আর মিন্টু কোন পাত্তা দিলাম না। সেতু নিঃশ্চুপে টর্চ হাতে বাইরে গেল। খানিক পরে ফিরে এলো এত্তগুলো গোলাপ নিয়ে। কে যেন তাকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিল। আর আমরা তাকে চোর মনে করলাম?
***
রানুদি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে খুব চঞ্চল মেয়ে। অসুস্থতার জন্য আমাদের বাড়ি একদম চুপচাপ। দুলুদার নিরিবিলি টিউটোরিয়ল হোমে সত্যিই নির্জনতা এসেছে। মার মন খারাপ। কারণ কিছু দিন পর পরই রানুদি অসুস্থ হয়ে পড়ে আর ঘন ঘন বমি করে। তার পেট এখন খুব বড় দেখা যায়। মা খুব ভয় পেয়ে যান। কি করবেন এই মেয়েকে নিয়ে।
মা কিছু বুঝতে না পেরে ছুটে যান মাসির বাড়িতে। শান্তি মাসি রানুদিকে দেখে বলে রানুর পেটে বাচ্চা আছে। চোখ মুখ গর্ভবতী মহিলাদের মত দেখাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকা হল। ডাক্তার বললেন যে রানুদি গর্ভবতী। মার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কি সর্বনাশ। কি করে রানুর পেটে বাচ্চা এল? রানুদির পেটে যে বাচ্চা এই ব্যাপারে ডাক্তার, মাসি এবং আমাদের পরিবারের সবাই জানে কিন্তু অন্য কাউকে বলতে নিশেধ করা হলো। আমাদের বাড়িতে দেখা গেল কৃষ্ণপক্ষের ছায়া।
মা মাসিকে বলেন, রানুটাকে নিয়ে এখন আমি কি করবো? বল তুই আমাকে বলে দেয়।
কি আর করবে দিদি। কিছুই করার নেই, যা হবার হয়ে গেছে।
কোন হারামজাদা আমার রানুর এমন সর্বনাশ করলো?
কোন সেই হারামজাদা?
খোঁজ খবর করতে হবে এবং উচিত শিক্ষা দিতে হবে।
মা রানুদিকে কাছে ডাকে। রানুদি এখন খুব শান্ত। তাকে কথা জিজ্ঞাসা করলে আর কথা বলে না। হাসেও না রাগও করে না। কি যেন ভাবে। মা রানুদিকে বলেন- বল রানু তোর গায়ে কে হাত দিয়ে ছিল? রানুদি কথা বলে না। মা আবারও জিজ্ঞাসা করে। রানুদি চুপ থাকে। অসুখ হলে রানুদি বাচ্চা মানুষের মত।
যেন কিছুই বুঝে না। মা তাকে অনুরোধ করে বললেন, বল মা বল কে তোর গায়ে হাত দিয়ে ছিল। কে তোকে চুমা দিয়েছিল, বল মা বল? রানুদি কি যেন বলতে চায়। কিন্তু সে ব্যর্থ। মুখ দিয়ে তার কথা বের হয় না।
মা এবার একটা লাঠি হাতে নেয়। লাঠি দেখিয়ে রানুদিকে বলেন, হারামজাদি বল কার সাথে শুয়েছিলি। রানুদি তবুও নীরব। যেন সে পৃথিবীর কোন ভাষাই বুঝে না। মা রানুদির পায়ে সজোরে আঘাত করতে লাগলো। রানুদি মূর্তির মত বসে থাকে। সে মূর্তি হয়ে গেছে। তার কোন অনুভ‚তি নেই। এমনভাবে তাকায় যেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না যে তার কি হতে যাচ্ছে। সে কোন বিপদের দিকে যাচ্ছে। সেতু মাকে থামায়। মার হাত থেকে লাঠি জোর করে নিয়ে নেয়। মাকে শান্ত হতে বলে। মা শান্ত হতে চাইলে কি শান্ত হতে পারবে। আমাদের পরিবারে এখন আগুন ধরে গেছে। এই আগুন নিভা না পর্যন্ত যেন পৃথিবীর কোন মা-ই শান্ত হতে পারবে না। মা অস্থির হয়ে উঠেন। চিন্তায় চিন্তায় মা আবার শুকিয়ে গেছেন। চোখ জোড়া গর্তে ঢুকে গেছে।
যে রানুদি আমাদের বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখতো সে আজ নিঃশ্চুপ হয়ে গেছে। যে এই বাড়ি থেকে ও বাড়িতে ছুটাছুটি করতো সে আজ অচল। চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। কিছু খেতে চায় না। এখন আর সন্ধ্যায় গান বা আবৃত্তির আসর বসে না। সকাল বিকাল রাত কেউ আর ড্রেসিন টেবিলের সামনে গিয়ে কেউ সাজে না। কেউ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে নিজের হাসি দেখে না। রানুদি এমনিতে খুব সুন্দরী। হাসলে আরো সুন্দর লাগতো। সে আয়নার সামনে গিয়ে সেজে গুঁজে দাঁড়িয়ে খানিক হাসবে। দেখবে হাসলে তাকে কেমন লাগে। কিন্তু এখন তার আয়নার সামনেও যাওয়ার ক্ষমতা নেই। এখন আর সাজতে চায় না। হেসে নিজের মুখ দেখাতো দূরের কথা। তার শরীর ক্রমে খারাপের দিকে যাচ্ছে।
দুঃখে মার মুখটা কালো হয়ে গেছে। দুঃখটা বড় ছোঁয়াছে। মার সাথে সাথে আমাদের বাড়ির সবার মুখেই কালো মেঘের মত ভাব চলে এসেছে। সবাই দুঃচিন্তায় আছি। দুলুদা তো তার ঘর থেকে বেরই হন না। আমাদের কাউকে রানুদিকে সমন্ধে কিছু বলেন না। আমাদের সবার মন খারাপ। তবু তার চাল চলন দেখে মনে হয় এ বাড়িতে কিছুই হয়নি। যেন সবাই খুব খুশি আছে।
রানুদি তার মুখ খোলেছে। সে বলেছে, মা রাতে স্বপ্নে কে যেন আমাকে নিতে আসে একদম রাজপুত্রের মত চেহারা। মনে হয় আমাকে বিয়ে করবে। মা শুনে কিছু বলে না। রানুদি আবার বলে মা রাজপুত্র আবার এলে আমি কি তার সাথে চলে যাব মা? মা কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন। না মা না আমি তোকে যেতে দিব না। তুই চলে গেলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো?
মা মাসিকে রানুদির সব কথা বললেন। মাসি বললেন, তোমার মেয়ে ভাল ডাক্তার দেখাও নয়ত তোমার মেয়ে বাঁচবে না।
চিকিৎসা করাবো?
হ্যাঁ চিকিৎসা করাও। কারণ মানুষ মরার আগে এইসব স্বপ্ন দেখে। ভাল চিকিৎসা করালে বাঁচতে পারে।
ঠিক আছে চিকিৎসা করাবো।
রানুদিকে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করানো হল। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। এবার দুলুদার টনক নড়ালো। সে মিঃ জনের কাছে প্রতি মাসে টাকা জমাতো। তার সেই জমানো প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে মার হাতে দিল। বললেন, রানুর চিকিৎসার জন্য খরচ করবেন। মা এত টাকা পেয়ে হতবাক, মা কিছু বলার আগেই দুলুদা বললেন। মিঃ জনের কাছে সাত বছর যাবৎ জমিয়েছি। মা কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে পড়লেন। মা ভাবলেন সত্যিই ঈশ্বর স্বর্গ দূত পাঠিয়েছেন সাহায্য করার জন্য। তিনি রানুদিকে বললেন, দুলু অনেক টাকা দিয়েছে তোর চিকিৎসার জন্য তুই আবার সেরে উঠবি। তোর পেটের বাচ্চা সিজার করে বের করা হবে। তুই আবার ভাল হয়ে উঠবি মা ভাল হয়ে উঠবি। রানুদি মার কথা শুনে ভয় পায়। সে ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। সে বলে মা দেখ কে যেন আমাকে ডাকছে? মা কারো ডাক শুনতে পান না। রানুদি আবার বলে মা দেখ আমাকে ঐ রাজপুত্র নিতে এসেছে। তুমি যে রকম রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দিবে বলেছিলে ঠিক সেই রকম রাজপুত্র। মা আমি যাবো। মা তার অসুস্থ মেয়ের প্রলাপ শুনে কাঁদতে থাকেন।
পাড়া প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করে কবে রানুদির কি অসুখ হয়েছে। কেন তাকে রাজশাহী মেডিক্যালে নেয়া হয়েছে। আমরা বলি তার বড় অসুস্থ করেছে কিন্তু একসময় ‘বড়’ অসুখের কথা বলে আর কাউকে বিশ্বাস করানো যায় না। সবাই জেনে গেছে রানুদির পেটে বাচ্চা এসেছে। কিভাবে হয়েছে? কে সেই ব্যক্তি? জবাব দিতে পারি না। আমরা কেউ জানি না। কি ভাবে রানুদির পেটে বাচ্ছা আসলো। তার কোন প্রমাণ নেই। আমরা পরিবারে সবাই অন্ধ। কেউ কিছু দেখি না। শুনি না। শুনতে অবশ্য চেয়েছি। রানুদি কেন এরকম করছে। রানুদি বলতে পারচ্ছে না। তার মুখে তালা লাগানো হয়েছে। মা কত জিজ্ঞাসা করলেন, মরলেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
রানুদি তো স্বপ্নও দেখে নি। কুমারী মারীয়া যেমন স্বপ্নে দেখেছিল। তার গর্ভে পবিত্র আত্মার প্রভাবে একটি পুত্র সন্তান হবে। তার নাম রাখা হবে উমুক বা তুমুক। তবে রানুদিও তো স্বপ্ন দেখেছে। সে তো আমাদের প্রায়ই বলে তাকে কে জানি নিতে আসে। তাকে তো কোন স্বর্গ দূত বলে না ‘প্রণাম তোমায়, পবিত্র আশিষে ধন্য তুমি। প্রভু তোমার সঙ্গেই আছেন। শোন তুমি গর্ভধারণ করবে। তোমার একটি পুত্র হবে। তা নাম রাখবে যীশু।’ মুক্তি দাতা যীশুর তো জন্ম হয়েই গেছে। পৃথিবীতে আর কেউ পবিত্র আত্মার প্রভাবে গর্ভবর্তী হবে না। রানুদিও নিশ্চয় পবিত্র আত্মার প্রভাবে গর্ববর্তী হয় নি। তা হলে কে সেই ব্যক্তি? আমি? না কি লজ্জ্ব! রানুদি আমার বড় বোন। তার রূপ যৌবন থাকতে পারে। তাকে সম্পূণ নগ্ন দেখেছি কিন্তু আমার সেই পশু পবৃত্তি তো জেগে উঠে নাই। আমি সম্পূর্ণ সূচী। তা হলে কি মিন্টু? অসম্ভব। পৃথিবীর কোন ইতিহাসে এই পর্যন্ত শুনি নি যে ছোট ভাই তার রক্তে বোনে সঙ্গে....। না কোন দিন সম্ভব নয়। এই সব আমার মনের ভুল ধারণা। মনে আমার প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি সেই ব্যক্তি দুলাল। যাকে আমরা প্রাণ ভরে দুলুদা বলে ডাকি। যাকে আমরা সমীহ করি। তিনি কি সেই ব্যক্তি? আমার বিবেক বলে, তা কি করে সম্ভব? তিনি তো আমাদের রক্তের ভাইয়ের মত। ‘মত’ শব্দটা ব্যবহার করলাম কারণ তিনি আমাদের রক্তের ভাই নয়। তিনি আমাদের পরিবারের একজন সদস্য। কারণ তিনি আমাদের রান্না করা ভাত খান। আমাদের সঙ্গে প্রার্থনা করেন। হাসেন, কাঁদেন। আমাদের জন্য অনেক কিছু করেন। যা কিনা আমি পরিবারের বড় ছেলে হয়েও করতে পারি না। মা পুরানো শাড়ি পরে থাকলেও নতুন শাড়ি কিনে দিতে পারি না। সেতু ও রানুদিকে নতুন কাপড় কসমেটিক কিনে দিতে পারি না। মা অথবা রানুদির অসুখ হলে ঔষধ কিনার জন্য সামর্থ পর্যন্ত রাখি না। অথচ স্বর্গ দূতের মত ছেলে দুলাল তা করতে পারছে। তাকে কিভাবে দোষ দেই যে রানুদির গর্ভের বাচ্চার জন্য সেই দায়ী? আর সবচেয়ে কথা আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নেই যে দুলুদা রানুদিকে নষ্ট করেছে।
ঐদিন মার সঙ্গে দুলুদাকে গল্প করতে দেখলাম। পাশের ঘর থেকে শুনছিলাম দুলুদা মাকে জিজ্ঞেসা করছে রানুকি কোন ছেলের কথা বলেছে?
না বাবা কিছু বলেনি।
ওকে জিজ্ঞেসা করুন, কে এত বড় হারামিপনা করলো।
ওকে জিজ্ঞেসা করে কোন লাভ হচ্ছে না। যেন কিছু বুঝে না।
যদি ধরতে পারি। বেটাকে খুন করে ফেলবো।
আমার সব শেষ হয়ে গেল বাবা। আমার সব শেষ হয়ে গেল।
সত্যি আমাদের সব সাজানো গোছানো সুন্দর পরিবারটা শেষ হয়ে গেছে। কারো মুখে হাসি নেই। সন্ধ্যায় এখন আর গানের আসর হয় না। আবৃত্তিও হয় না। সবাই চুপচাপ হয়ে থাকে। মিন্টু বাড়িতে আর গানের চর্চা করে না। আমাদের বাড়িতে ওর বন্ধুরাও এখন আসে না। সূচনাও আসে না। সব দিকে এখন সংকট। সেতু গভীরভাবে ধ্যান করে। তাকে খুব জ্ঞানী মনে হয়। চুপচাপ বসে কি যেন চিন্তা করে। তার কবিতায় এখন এখন ব্যর্থতার কথা লেখা থাকে। আমার জানা মতে সে তো ব্যর্থ হয়নি। ব্যর্থতা এসেছে রানুদির। সর্বসমেত ভাবে আমাদের সবার। রানুদির হয়ে এবং আমাদের হয়ে সেতু তার কবিতায় এত সুন্দর করে ব্যর্থতা, দুঃখ বর্ণনা করে। সত্যিই অবাক লাগে। সেতু নীরবে প্রতিনিধি হয়ে আমাদের পরিবারের দুঃখগাথা কলমের খোচায় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করছে। কিন্তু আমরা কেউ জানতে পারছি না কে সেই ব্যক্তি যে রানুদির এত বড় ক্ষতি করলো।
হাটে বাজার বা রাস্তায় দু’একজন পরিচতিদের সঙ্গে দেখা হলে রানুদির সমন্ধে জিজ্ঞোসা করে। তখন কি জবাব দিবো তার ভাষা খুঁজে পাই না। নিজেকে খুব বোকা মনে হয়।
***
রানুদির অবস্থা খুব খারাপ। দু’একদিনের মধ্যে বাচ্চা হবে। আমি মামা হবো কিন্তু আমার ভাগিনা বা ভাগিনীটির জন্ম অবৈধভাবে। এটা মেনে নেয়া খুব কঠিন। তবু নিজেকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম যে আমি মামা হতে যাচ্ছি। কম কথা নাকি? ভাগ্নি বা ভাগিনার বাবা নেই তো কি হয়েছে তারা মা আছে, মামা আছে। আমরা তাকে আদর যতœ করে মানুষ করবো।
রানুদির বিয়ে হবার শখ ছিল। মাকে সে প্রায়ই বলতো তার সব বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। ওদের কি সুন্দর সুন্দর ফুটে বাচ্চা হয়েছে। রানুদি সেই বাচ্চাদের কি মমতায় কোলে নিতো। সে মনে মনে হয়তো ভাবতো আমারও একদি বাচ্চা হবে। ওকে আমি কত আদর করবো। বুকের সুধা ঢেলে দিবো। সকল মাতৃত্ব বুকের ধনটাকে দিয়ে দিবো। কিন্তু তার সেই আশা পূর্ণ হবে? প্রত্যেক নারীর ইচ্ছা থাকে ‘মা’ মধুর ডাক শুনার। রানুদির ও খুব ইচ্ছা ছিল। সে আমাদের সবাইকে বলতো তার ছেলে হলে তার নাম সে জয় ছাড়া অন্য কিছু রাখবে না। তাই বাড়ির সবাই যে তার ছেলে হলে জয় নাম রাখা হবে। তাই আমি আর মিন্টু তাকে জয়ের মা বলে ডাকতাম। রানুদির চোখ উজ্জ্বল হয়ে যেত। সে লজ্জ্বিত ভঙ্গিতে থাকতো।
জয়ের কথা রানুদি আমাদের বাড়ির মিনিকেও বলতো। মিনি আমাদের বাড়ির সাদা বিড়ালটা। মিনি রানুদির খুব প্রিয়। মিনি সারাক্ষণ রানুদির পিছু পিছু ঘোরাঘুরি করতো। অসুস্থ রানুদি শুয়ে থাকলে মিনিও খাটের উপর উঠে রানুদির পাশে বসে থাকতো। রানুদি মিনির কাছে তার ছেলে জয়ের কথা বলতো। মিনি কান খাড়া করে দিয়ে শোনতো। মাঝে মাঝে মিনি কান অথবা লেজ নেড়ে রানুদির কথায় সাপোর্ট দিতো।
মা মাসি যোগাযোগ করে ঢাকা ইসলামপুরে মাদার তেরেজা স¤প্রদায়েল সিস্টারদের সাথে। সেখানে রানুদিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সিস্টারদের রানুদির সমস্যাটার কথা বলা হয়। তারা বাচ্চা তাদের দায়িত্বে পালন করার কথা দেন। সেখানে তিনদিন থাকার পর রানুদি একটি সত্যি একটি ফুট ফুটে বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয় নি। রানুদির ইচ্ছা মত ছেলেটার নাম সিস্টারগণ জয় রেখেছেন। শুনে খুব আনন্দিত হলাম। রানুদির ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। খারাপ লাগে মামা হয়েও ভাগ্নেকে কাছে রেখে আদর করতে না পারার।
বাবা মৃত্যুতে ততটা শোকে কাতর হই নি। কিন্তু রানুদির মৃত্যুতে বাড়ির সবাই শোকে বিহŸল। আবার একদিকে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রতিশোধের আগ্নিফুলকি নেত্রদ্বয় হতে ঝরতে লাগলো। পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে শত্রæকে সাতগুণ সত্তুরবার ক্ষমা করতে হবে। অর্থ্যাৎ বার বার ক্ষমা করতে হবে। কিন্তু আমার শত্রæটা কে? সেটা তো জানি না। তাই নিজের প্রতিহিংসার কাছে বার বার নিজেই হেরে যাচ্ছি। পৃথিবীটা খুব রহস্যময় মনে হয়। বাস্তবতা বড় ঠিন। আমি সব দুঃখ ভুলে যাবার চেষ্টা করি কিন্তু বাড়ির সবার মুখ অন্ধকার। হঠাৎ আমাদের পরিবারে একটা কাল বৈশাখীল ঝড় বয়ে গেল। এই ঝড়ে আমাদের পরিবারটা তছনছ হয়ে গেছে। আর কি কখনো আগের মত নির্মল আকাশ আমরা খুঁজে পাব? যেখানে থাকবে না কোন কালো মেঘ।
কয়েক দিনপর সূচনা আমাদের বাড়িতে এলো। এসেই সেতুকে জড়িয়ে ধরলো। দুই বান্ধবী অনেকক্ষণ গল্প করলো। আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিল আমেরিকা যাবার জন্য। সেখানে মিন্টু ছিল না। সূচনা এসেছে শুনেও সে তার ঘরে কি যে করছিল। সূচনা কাকে যেন খুঁজছিল। তার সারা চাঁদ মুখটা ক্লেশের ছাপ। সে চলে যাচ্ছে এমন সময় মিন্টু তার গল থেকে সূচনাকে ডাক দিল। সূচনা ল²ী মেয়ের মত মিন্টুকে অনুসরণ করলো। মিন্টুর ঘরে একটা স্টোভ আছে। কেরোসিন দিয়ে চলে। সে নিশ্চয় এতক্ষণ তার প্রিয় মানুষটার জন্য চা প্রস্তুত করেছে। তাই বাইরে আসে নি। সূচনা মিন্টুর ঘরে গিয়ে বসল। তারা কিছুক্ষণ নীরব। মিন্টু চা ঢেলে দিলো। নিজে নিলো না। সূচনা এক চুমুক দিয়ে বসলো এত মজার চা আমি একা খাব কেন। তোমারটা কোথায়?
আমি আজ খাবো না শুধু তোমার খাওয়া দেখবো। তৃপ্তি নিয়ে সূচনা চা পান করে। মিন্টু প্রাণ ভরে সূচনার চা খাওয়া দেখে। যে মেয়েটি আগামীকাল এ গ্রাম ছেড়ে এই দেশ ছেড়ে হাজার হাজার কি.মি দূরে চলে যাবে। সেখানে গিয়ে হয়ত বিয়ে হয়ে যাবে। তখন তাকে আর এত কাছে পাওয়া যাবে না সেই অধিকার আর থাকবে না। তার সঙ্গে যৌথ কণ্টে গান গাইতে পারবে না। তার সামনে বসে এভাবে আর চা খাবে না। তাই মিন্টু নখদর্পনে সূচনার চিত্র হৃদয়ে এঁকে রাখছে। সূচনার সঙ্গে তার বন্ধুত্বের মাত্র সূচনা হয়েছিল শেষ হয় নি। কিন্তু মনে হচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। মিন্টু বড় নিঃশ্বাস ফেলে। সূচনা বলে এভাবে তাকিয়ে কি দেখছ?
তোমাকে দেখছি। একটু অভিমানের সুরে বলে। মিন্টু সূচনাকে বলে, তোমাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করবে। তোমার হাতের মজার চা, তোমার গান কোনদি ভুলবো না।
মিথ্যো কথা। আমাকে ভুলে যাবে।
তুমি কি আমাকে ভুলতে পারবে?
মিন্টু নীরব।
সূচনা বলে, প্রেম করে বিয়ে করলে কেউ সুখি হতে পারে না। আমি প্রেম করে বিয়ে করতে চাই না।
ভাল।
তুমি আমাকে চিঠি লিখবে না।
লেখবো। ঠিকানা দিয়ে যাও।
এই নাও আমার বাবা ভিজিটিং কার্ড। এই ঠিকানায় চিঠি লিখবে।
নীরবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মিন্টু কার্ড নেয়।
সূচনা বলে মিন্টু আমি চাই তোমার বাবার ইচ্ছা পূরণ করবে। আমার জন্য কেন তুমি সেমিনারীতে যাবে না? তুমি ফাদার হও। তোমার বাবা-মার ইচ্ছা পূর্ণ কর এটাই আমি চাই।
মিন্টু নীরব।
সূচনা বলে, আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবো। যত দূরেই যাই তুমি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু বলে স্থান দিয়েছি। ঠিক আছে আমি ঢাকায় সেমিনারীতে যাবো। কিন্তু পুরোহিত হলে কোনদিন তোমার সামনে দাঁড়াতে বলো না। দূর থেকেই প্রার্থনা করো যেন ঈশ্বরের ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারি।
সূচনা বিদায় নিয়ে চলে আসে। মিন্টু যতটা শক্ত হওয়ার হয়ে রয়।
সূচনা আমেরিকায় চলে যায়। তারা সেই দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। সূচনা মিন্টুকে চিঠিদিয়েছে। মিন্টু সেই বছরই সেমিনারীতে যোগ দেয়।
প্রিয় বন্ধু,
তোমাকে জানাই অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালবাসা। আশা করি তুমি ভাল আছ। আমিও বাবা-মার সঙ্গে ভাল আছি। আমি নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমাদের পরীক্ষার জন্য তোমাকে চিঠি দিকে পারি নি। তোমার চিঠি অনেক দিন আগেই পেয়েছি। তোমাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমার নেই। তুমি ভালভাবে থাকবে এটাই আমি চাই। তুমি ওখানে কেমন আছ এবং কিভাবে আছ তা জানাবে। তোমার সেমিনারীতে ভাললাগে কিনা জানাবে। আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি কিন্তু তোমাকে কোন দিন পাব না। তাই তোমাকে কষ্ট দিতে এবং পেতে চাই না। আমাদের পরিবারে সবাই তোমার কথা জানে। তুমি আমাকে চিঠি দিয়েছ মা সেটা জানে এবং বুঝতে পরেছে তুমি আমাকে পছন্দ কর। মা আমাকে বলেছে আমি যেন তোমাকে চিঠি না দেই। কারণ তোমাকে চিঠি দিলে তোমার সমস্যা হতে পারে। আমি চিঠি না লেখলেও তুমি চিঠি লিখবে। তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না। ভাল থেকো। খুব ভাল।
ইতি
সূচনা।
মিন্টু পত্রটি পড়ে মনে বড় শান্তি পায়। সেভাবে সত্যিই তার বন্ধু খুব ভাল। এত ভাল না হলে কি তাকে বুঝাতো। খুব ছোট বেলা থেকে মিন্টুর ইচ্ছা পুরোহিত হওয়ার। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় সূচনার সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়। তাই সেমিনারীতে যাওয়ার কথা প্রায় ভুলেই যায়। এখন সে হারে হারে বুঝতে পেরেছে বাস্তবতা সত্যিই নির্মম। তবে নির্মমতাকে মেনে নিলেই সব সহজ মনে হয়।
মিন্টু অনেক চিন্তা করে দেখে যে সত্যি তার পুরোহিত হবার আহŸান আছে। অতীতে যুগে যুগে ঈশ্বর বিভিন্ন নবী, প্রবক্তাদের আহŸা করেছেন। সব মানুষেরই জীবনে ঈশ্বরের একটা পরিকল্পনা আছে। মিন্টু বুঝতে পারে তার জীবনেও পুরোহিত হবার জন্য ঈশ্বরের পরিকল্পনা। ঈশ্বর বিভিন্ন ঘটনা বা ব্যক্তির মাধ্যমে তার দ্রাক্ষাক্ষেত্রে কাজ করার জন্য আহŸান করে থাকেন। এই কথা মিন্টু অনেকবার শুনেছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে পড়েছে।
মিন্টু গান বাজানায় বেশ ভাল ছিল। সেখানে গিয়ে সবার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়। রেক্টরদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। ফলে সেমিনারীর রেক্টরস বা পরিচালকগণ তার প্রতি সন্তুষ্ট। সেও সেমিনারীতে খুব ভাল আছে। সেখানের সবকিছু তার কাছে ভাললাগে। সেখানে বেশ কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। এই যেমন ভোর পাঁচটায় বিছানা ছাড়তে হবে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় আধঘন্টা ধ্যান-প্রার্থনা করতে হবে। তারপর পবিত্র খ্রীস্টযাগে অংশগ্রহণ করতে হবে। খ্রীস্টযাগের পর সকালের নাস্তার আগে নীরবতা পালন করতে হবে। নাস্তার টেবিলে সবাইকে গুড মনিং জানাতে হবে। নাস্তার পর যার যার নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে এবং ফাদার হওয়ারজ জন্য প্রফেসরদেও ক্লাশে অংশ নিতে হবে। ক্লাশ বন্ধ থাকলে পড়াশুনা করতে হবে, ইত্যাদি। বাংলাদেশে ঢাকার বনানী গোরস্তানের পাশেই কাথলিক খ্রিস্টানদের একমাত্র জাতীয় সেমিনারী। স্বাধীনতার পর স্থাপিত সেখান থেকেই ফাদার হওয়ার প্রশিক্ষন দেয়া হয়। এর আগে ফাদার হওয়ার জন্য যেতে হবো ইটালির রোমে বা পাকিস্তানের রাচিতে।
***
রানুদি আমাদের ছেড়ে চলে আজ প্রায় এক মাস। তাই বাড়িটা এখন বড় খালি খালি লাগে। মা প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। বাড়িটা একদম নিঃশ্চুপ। সেদিন রাতে বৃষ্টি হয়। আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত বৃষ্টি। আমি আমার ঘরে বসে পড়ছিলাম। রাত তখন এগারটার মত বাজে। বৃষ্টি শুরু হবার আগেই বিদ্যুৎ চলে যায়। বৃষ্টির দিনে চারদিক ভৌতিক অন্ধকার খাঁ খাঁ করে। আমি একটু বারান্দায় এলাম। দেখি সেতু তার ঘরে থেকে বের হচ্ছে। তখনো আকাশে তুমুল বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বিদ্যুতের আলোক ঝলকানিতে যা দেখতে পেলাম তাতে ভয় পেয়ে গেলাম। সেতুর হাতে একটা ধারালো ছুরা। বিদ্যুতের ঝলকানিতে রক্তমাখা ছুরাটা চকচক করে উঠলো। সেতুর ক্লান্ত দেহ। চুল খোলা। তাকে সম্পূর্ণ ক্লান্ত এবং অবসন্ন মনে হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেসা করলাম, সেতু অন্ধকারে কি করিস?
খুন করেছি দাদা।
কি!
বার বার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। সেই ক্ষণিক আলোতে বুঝতে পারলাম যে সেতুর সারা শরীর রক্তে মাখামাখি!! তাই দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে বাতি আনলাম। দেখি কাঁপছে!!! ঘরের মেঝেতে দুলুদা গলাকাটা মুরুগীর মত পড়ে আছে। চারিদিকে রক্তের সমুদ্র বয়ে চলেছে। আমি কি করবো না কবো ভেবে পাচ্ছি না। কেরোসিনের বাতির আলোতে আমাকে দেখে দুলুদা পায়ে জড়িয়ে ধরলো। সে মাপ চাওয়ার ভঙ্গিতে কি যেন বলতে চাইলো। কিন্তু বলতে পারলো না। হাত জোড় করে করুণ দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি বুঝতে পারছিলাম সে মরে যাচ্ছে।
সেই রাতেই পুলিশ এসে সেতুকে ধরে নিয়ে গেল। প্রমাণিত হয়েছে সেতু ছুরা দিয়ে তিনবার পেটে আর দু’বার গলায় আঘাত করেছে। সেতু নিজেই আদালতে স্বীকার করেছে। তবে সে কেন খুন করেছে তা কারো কাছে বলছে না। এমনকি আদালতেও না।
সেতুকে টেষ্ট করা হলো। না সে সম্পর্ণ সুস্থ দেহে ও সুস্থ মস্তিষ্কে দুুলুদাকে খুন করেছে। সেতু নিজেও বার বার কোটে বলেছে যেন তার শাস্তি হয়। এরূপ স্বেচ্ছায় অন্যায় করা এবং শাস্তি নেওয়া সবাইকে অবাক করে দেয়, কিন্তু একজন শিক্ষক আমার মায়ের ভাষায় একজন ফেরেস্তাকে কেন খুন করলো তা রহস্যজনক। আবার গভীর রাতে সে কেনই বা সেতুর ঘরে গেল তা ও রহস্যজনক। সেতুকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অনেক কিছু জানতে চাওয়া হলো। সে মুখ খেলেনি। শুধু বলেছে, আমার ফাঁসি হোক।
পরদিন সকালে একটি ছেলে আমাদের বাড়ি এসে উপস্থিত। তার চোখে মুখে চঞ্চলতা কিন্তু ক্লেশের ছাপ। সে এসে ছালাম দিল। আমিও ছালামের উওর দিলাম।
আমি সেতুর বন্ধু তুহিন।
ও তোমার কথা সেতুর মুখে শুনেছি।
কি ভাবে এমন দূঘটনা ঘটলো বড় ভাইয়া আপনি কিছু জানেন না?
না।
সেতুর কাছ থেকে আমি ১ হাজার টাকা নিয়েছিলাম।
এই নিন ভাইয়া। আমি হাত বাড়িয়ে নিলাম। তুহিন কথা না বাড়িয়ে বললো, ভাইয়া সেতুর কাছে আমার একটা ডাইরি আছে। যদি দয়া করে দিতেন। মাথা নিচু করে বলে তুহিন।
বললাম এসো বসো।
আমি বের করে দিচ্ছি। সেতুর টেবিল থেকে ঘাটাঘাটি করে অনেক খুজাখুজির পর একটা লাল মোটা ডাইরি পেলাম। ডাইরিতে কবিতায় পূর্ণ। সেটি তুহিন কে দিলাম। সে ধন্যবাদ জানিয়ে নিলো এবং সেতুকে যে জেলখানায় রাখা হয়েছে সেই সে খানার ঠিকানা নিল। সে ডাইরি হাতে নিয়ে চলে গেল।
সেতুর ঘর এখন বড় ফাঁকা হয়ে গেছে। তার টেবিলে বই, কাগজ পত্র দিয়ে বোঝাই। হয়ত এগুলোর স্তুপে খোঁজলে তুহিনের দেওয়া দু’একটা প্রেমপত্র পাওয়া যাবে। তুহিনকে নিয়ে লেখা অনেক কবিতা পাওয়া যাবে। সেই সব পত্রে তাদের দু’জনের কত ভালোবাসার কথা লেখা আছে। প্রথম যৌবনে ভালবেসে যে সব লেখে সেই সব। আমি আর সে গুলি দেখলাম না। থাক ছোট বোনের সব কিছু স্মৃতি হয়ে থাক।
সূচনা সেতুকে একটা চিটি লেখে। কিন্তু সূচনা তো এত দূর থেকে জানতে পারেনি যে সেতু এক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। তবে সূচনা রানুদির ব্যাপারে তার নিজের মতামত জানালো,
ঈশ্বর সহায়
প্রিয় সেতু,
অনেক অনেক শুভেচ্ছা নিস। কেমন আছিস? আমি বেশ ভাল আছি। এখানে নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছি। বেশ লাগছে। তোকে একটা কথা বলতে চাই। তা হলো তোদের বাড়ির দুলালদাকে আমার বেশি ভাল মনে হয় না। যাকে তোরা সবাই সমীহ করিস। তার চাহনি ভাল না। একবার সে আমার গায়ে হাত দিয়েছিল। সম্মানিত হওয়ায় কাউকে কিছু বলিনি। এখন মনে হচ্ছে রানুদির সর্বনাশের পেছনে মুখোশধারী দুলুল দায়ী। তাকে অন্য কোথাও চলে যেতে বল। তোর মিন্টুদার মন পরিবর্তন হয়েছে। সে ফাদার হওয়ার ইচ্ছা চালিয়ে যাছেছ জেনে খুব লাগছে।
তোদের বাড়ির সবাইকে আমারা শুভেচ্ছা দিস।
ইতি,
তোর বান্ধবী
সূচনা।
সেতুকে চিঠিটা পড়তে দিতে পারি নি। ঐ রাতেই তার ফাঁসি কার্যকর হয়ে যায়। আমি গেলাম সেতুর লাশ আনতে সঙ্গে সেতুর বন্ধু তুহিনও ছিল। শীতের রাত। দুজন সারা রাত বসে আছি। লাশ শেষ রাতে আমদের ফেরত দিতে দিবে। আমরা দু’জন বসে রইলাম। আকাশ গলে গলে সারা রাত ঘন কুয়াশা পড়ছে। এই কুয়াশার রাতেও জোছনায় আলোকিত চারি পাশ। আজ এত সুন্দর জোছনা কেন? সেতু আমাদে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাই। রানুদি চলে গেল। সেতু চলে গেল। বাগানের শ্রেষ্ঠ ফুল গুলোই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন মায়াবী জোৎস্না ঝরে যায় নিঝুম রাতে। সেই সাথে তুহিনের গাল বেয়ে কুয়াশার অশ্রæ ঝরছে। আমি সারা রাত প্রার্থনা করছি যাতে বোনটি স্বর্গে যায়। ওর আত্মা যেন কষ্টে না থাকে।
তুহিন পাশে বসে সেতুর আত্মার কল্যাণের জন্য দোয়া করল। সেতু একজন খুনি। তাকে নিয়ে সারা দেশে অনেকে আলোচনা সমালোচানা ও নিন্দা হচ্ছে, হবে। তবে এই পবিত্র ভোরে কেন জানি মনে হচ্ছে সেতু শিশিরের মত স্বচ্ছ। সে এত স্বচ্ছ বলেই তার জন্য আমরা দু’টা প্রাণী সারা রাত কুয়াশায় ভিজে এখন শিশির হয়ে গেছি। সে আমাদের কাছে কখনোই নিন্দিত হবে না। কিন্তু নন্দিত নন্দিনি হয়েই আমাদের হৃদয়ে নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে জড়িয়ে থাকবে।
ভোরে তুহিন আযান দিল সেতুর আত্মার কল্যাণের জন্য। তখন পাখির দু’একটা গান শুনা যাচ্ছে। অন্ধকারে স্বচ্ছ আলো ফুটে উঠেছে। আমরা সেতুর প্রাণহীন দেহটাকে নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম\
শেষ
‘ঝরে যাওয়া জোৎস্না’ রচনা কাল ২০০৩ খ্রীষ্টাব্দ

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন